বিশ্ব হার্ট দিবস ২৯ সেপ্টেম্বর

হৃদয় বাঁচলে জীবন বাঁচবে

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। মানুষের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হৃৎপিণ্ডকে ঘিরে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে দিবসটি পালনের সূচনা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে হৃদ্‌স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

হৃৎপিণ্ডকে আমরা সাধারণত ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু জীববিজ্ঞানের ভাষায় হৃদয় হলো শরীরের একটি শক্তিশালী পেশিবহুল অঙ্গ, যার প্রধান কাজ হলো সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদ্‌যন্ত্র সাধারণত প্রতি মিনিটে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। এই নিরন্তর স্পন্দনের মাধ্যমে অক্সিজেন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্ত শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
মানুষের হৃদ্‌যন্ত্র চারটি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত ডান অলিন্দ, ডান নিলয়, বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়। হৃদ্‌যন্ত্রের ভালভগুলো রক্তকে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে। ডান পাশের অংশ শরীর থেকে অক্সিজেন-স্বল্প রক্ত ফুসফুসে পাঠায়। ফুসফুস থেকে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত বাম পাশের হৃদ্‌যন্ত্রে ফিরে আসে এবং সেখান থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুস একসঙ্গে কাজ করে শরীরের কোষগুলোকে সচল রাখে।
কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রায় এই স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হৃদ্‌রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো করোনারি ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া। রক্তে অতিরিক্ত নিম্ন-ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন বা কোলেস্টেরল দীর্ঘদিন বেশি থাকলে ধমনির দেয়ালে প্লাক তৈরি হতে পারে। ধীরে ধীরে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্লাক ফেটে রক্ত জমাট বাঁধলে হঠাৎ রক্তনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন হৃদ্‌পেশিতে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপও হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য একটি নীরব বিপদ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শক্তি প্রয়োগ করে রক্ত পাম্প করতে হয়। এর ফলে সময়ের সঙ্গে হৃদ্‌পেশি পুরু হয়ে যেতে পারে এবং হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
ধূমপান হৃদ্‌স্বাস্থ্যের আরেক বড় শত্রু। তামাকের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে, রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন বাড়াতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। শুধু সরাসরি ধূমপান নয়, পরোক্ষ ধূমপানও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
তবে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আশার জায়গাও রয়েছে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পরিমিত ও সুষম খাদ্য, ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার কিংবা বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অন্যান্য ব্যায়াম হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে যাদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
বিশ্ব হার্ট দিবসে তাই শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন জীবনযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অঙ্গীকার। দূরপাল্লার দৌড়, হাঁটা, সভা-সমাবেশ, ফিটনেস কার্যক্রম ও বিজ্ঞান প্রদর্শনীর মতো কর্মসূচি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতা শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই।
হৃদ্‌যন্ত্র আমাদের শরীরের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী। আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও এটি কাজ করে, বিশ্রাম নিচ্ছে না। তাই হৃদয়ের প্রতি যত্ন নেওয়া মানে শুধু একটি অঙ্গকে রক্ষা করা নয় নিজের জীবন, পরিবার এবং ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল শিক্ষা তাই সহজ হৃদয়কে ভালোবাসুন, হৃদ্‌যন্ত্রকে সুস্থ রাখুন। কারণ একটি সুস্থ হৃদয় শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, একটি সক্রিয়, স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনেরও ভিত্তি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ