কালজয়ী সুরস্রষ্টা কুমিল্লার মাটি থেকে উপমহাদেশের সংগীতাকাশে শচীন কর্তা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লোকসুর, শাস্ত্রীয় সংগীত আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে যিনি সৃষ্টি করেছিলেন স্বতন্ত্র এক সংগীতভুবন

উপমহাদেশের সংগীতজগতের কিংবদন্তি শিল্পী শচীন দেব বর্মণের জন্মদিন কাল। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী একাধারে সংগীত পরিচালক, সুরকার, গায়ক ও লোকসংগীতের অনুরাগী ছিলেন। সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি ‘এস ডি বর্মণ’ নামে পরিচিত হলেও কলকাতার সংগীতাঙ্গনে আপনজনেরা ভালোবেসে ডাকতেন ‘শচীন কর্তা’ নামে। তাঁর কণ্ঠের নিজস্ব টান, সুরের মাধুর্য এবং লোকসংগীতের গভীর শিকড় থেকে উঠে আসা সৃষ্টিশীলতা তাঁকে উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সময় পেরিয়েছে প্রায় এক শতাব্দী। বদলেছে সংগীতের ভাষা, প্রযুক্তি ও শ্রোতার রুচি। কিন্তু শচীন দেব বর্মণের গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে একইভাবে অনুরণিত হয়। তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সুরকে মিলিয়ে দেওয়া। নদী, নৌকা, মাঠ, মাটি, বিরহ, প্রেম কিংবা প্রকৃতির অনুষঙ্গ সবকিছুই তাঁর সংগীতে পেয়েছে সহজ অথচ গভীর প্রকাশ।

শচীন দেব বর্মণ জন্মেছিলেন তৎকালীন কুমিল্লায়, বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায়। তিনি ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেব বর্মণ ছিলেন সেতারবাদক ও ধ্রুপদী সংগীতশিল্পী। মা নিরুপমা দেবী ছিলেন মণিপুরের রাজপরিবারের সন্তান। নয় সন্তানের মধ্যে শচীন ছিলেন অন্যতম। রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর মন পড়ে থাকত সংগীতের জগতে। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন তিনি।

তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু কুমিল্লায়। ১৯২০ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে আইএ ও পরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সংগীতই তাঁকে বেশি টেনে নেয়। কলকাতায় অবস্থানকালে তাঁর সংগীতচর্চা আরও বিস্তৃত হয়।

সংগীতের সাধনায় তিনি একাধিক গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছেন। কে সি দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খান ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মতো শিল্পীদের কাছ থেকে সংগীতের নানা দিক সম্পর্কে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন। ফলে তাঁর সংগীতে একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত তৈরি হয়, অন্যদিকে বাংলার লোকজ সুরের প্রাণও অটুট থাকে।

শচীন দেব বর্মণের সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল লোকসংগীতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। বাংলার নদী, নৌকা, মাঝি, কৃষক, গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও আবেগ তাঁর সৃষ্টিতে বারবার ফিরে এসেছে। তিনি লোকসুরকে কেবল সংগ্রহ করেননি, তাকে নিজের সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে নতুন রূপ দিয়েছেন।

১৯৩৪ সালে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে তাঁর পরিবেশনা সংগীতাঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। একই সময় বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সেও তাঁর পরিবেশনা প্রশংসিত হয়। কুমিল্লা ও পূর্ববঙ্গের লোকজ পরিবেশ তাঁর সুরের ভেতরে এমনভাবে মিশে ছিল যে তাঁর গান শুনলে আজও বাংলার মাটি ও মানুষের গন্ধ অনুভব করা যায়।

‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ গানটির সঙ্গে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। লোকঐতিহ্যের একটি গানের ভাবকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৩৫ সালে তাঁর কণ্ঠে গানটির রেকর্ড প্রকাশিত হওয়ার পর তা শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর কণ্ঠের স্বাভাবিকতা ও আবেগ গানটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিল।

বাংলা গানের জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করার পর শচীন দেব বর্মণের সামনে খুলে যায় চলচ্চিত্র সংগীতের বিশাল দরজা। ১৯৩০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মুম্বাইয়ে গিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় যুক্ত হন। সেখানে তিনি এমন এক স্বতন্ত্র সুরভাষা তৈরি করেন, যা শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামো, লোকসুর এবং আধুনিক চলচ্চিত্র সংগীতকে একসঙ্গে ধারণ করেছিল।

হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন উপমহাদেশের একাধিক প্রখ্যাত শিল্পী। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়সহ বহু শিল্পীর কণ্ঠ তাঁর সুরকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। তাঁর সুর করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা শতাধিক বলে বিভিন্ন জীবনী ও সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘গাইড’, ‘অভিমান’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত আজও ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। বিশেষ করে তাঁর সুরের মধ্যে যে সরলতা ছিল, তা শ্রোতাকে প্রথম শুনতেই আকৃষ্ট করত। জটিল সুরকে সহজ করে তোলা এবং সহজ সুরের মধ্যে গভীর আবেগ সৃষ্টি করা ছিল তাঁর অন্যতম বড় শক্তি।

শচীন দেব বর্মণের দীর্ঘ সংগীতজীবন পেয়েছে নানা স্বীকৃতি। ১৯৩৪ সালের বেঙ্গল অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, এশিয়া ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার, পদ্মশ্রীসহ বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হন। চলচ্চিত্র সংগীতেও তিনি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেন।

তবে পুরস্কারের তালিকা দিয়ে শচীন দেব বর্মণের অবদানকে পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কারণ তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মানুষের ভালোবাসা। যে গান একসময় রেডিওতে শুনে মানুষ মুগ্ধ হয়েছে, সেই গানই পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরা নতুন করে গেয়েছেন, শ্রোতারা শুনেছেন এবং নতুন প্রজন্মও তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে

১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর পরও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গান নতুন নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে।

শচীন দেব বর্মণের জীবন যেন একটি দীর্ঘ নদীর মতো যার উৎস কুমিল্লার মাটি, যার স্রোতে মিশেছে বাংলার লোকজ জীবন, শাস্ত্রীয় সংগীতের সাধনা এবং উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের বিশাল পরিসর। তিনি রাজপরিবারে জন্মেছিলেন, কিন্তু তাঁর গান রাজপ্রাসাদের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। তাঁর সুর পৌঁছেছিল সাধারণ মানুষের ঘরে, মানুষের আনন্দ-বেদনায়, প্রেম-বিরহে, স্বপ্ন ও স্মৃতিতে।

আজ তাঁর জন্মদিনের প্রাক্কালে তাঁকে স্মরণ করলে কেবল একজন সংগীত পরিচালককে স্মরণ করা হয় না; স্মরণ করা হয় এমন একজন শিল্পীকে, যিনি বাংলার লোকজ সুরকে বৃহত্তর সংগীতভুবনে মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল মাটির টান, তাঁর সুরে ছিল মানুষের কথা। তাই সময়ের স্রোত যতই এগিয়ে যাক, শচীন দেব বর্মণের গান পুরোনো হয় না।

একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। শচীন দেব বর্মণও চলে গেছেন পাঁচ দশক আগে। কিন্তু তাঁর গান আজও বাজে রেডিওতে, টেলিভিশনে, মঞ্চে, ঘরের নিভৃত কোণে কিংবা কারও একান্ত স্মৃতিতে। তাঁর সুর শুনলে মনে হয়, দূরে কোথাও যেন বাংলার নদী বয়ে যাচ্ছে, মাঝি বৈঠা টানছেন, বাতাসে ভেসে আসছে অচেনা অথচ চিরচেনা কোনো গান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ