শুধু পাঠদান নয়, মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন শিক্ষক

শিক্ষক: জ্ঞানের আলোয় প্রজন্ম গড়ার নীরব কারিগর

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

একটি শিশুর হাতে যখন প্রথম বই তুলে দেওয়া হয়, তখন তার সামনে খুলে যায় এক নতুন পৃথিবীর দরজা। অক্ষর চেনা থেকে শুরু করে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য, ভালো-মন্দের বিচার, স্বপ্ন দেখার সাহস এবং মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় একজন শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর ওপর, যাঁরা প্রতিদিন নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও চরিত্র গঠনে কাজ করে চলেছেন।

বাবা-মায়ের পর একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে গভীর প্রভাব বিস্তারকারী মানুষদের একজন শিক্ষক। বাবা-মা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, আর শিক্ষক তাকে সেই পৃথিবীকে বুঝতে শেখান। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার যে শিক্ষা তার বড় একটি অংশ আসে শিক্ষকের কাছ থেকেই।

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৬৬ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার শিক্ষক মর্যাদা-বিষয়ক সুপারিশের স্মরণে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়। শিক্ষকতার পেশার মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত প্রস্তুতি, নিয়োগ ও কর্মপরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই শুধু শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয় যাঁরা একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৈরি করছেন, তাঁদের আমরা কতটা মর্যাদা দিচ্ছি, তাঁদের কাজের পরিবেশ কেমন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা দায়িত্বশীল।

একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখান না। তিনি একজন শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনতে সাহায্য করেন। অনেক সময় একটি উৎসাহের বাক্য, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা একজন শিক্ষকের বিশ্বাস একটি শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে। ‘তুমি পারবে’ এই ছোট্ট কথাটিই হয়তো কোনো হতাশ শিক্ষার্থীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস দেয়।

একজন ভালো শিক্ষক তাই শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে শিক্ষার্থীকে বিচার করেন না। তিনি বোঝার চেষ্টা করেন কেন কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে, কার বই কেনার সামর্থ্য নেই, কে পারিবারিক সমস্যার কারণে মনোযোগ হারাচ্ছে কিংবা কে আত্মবিশ্বাসের অভাবে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারছে না। এখানেই শিক্ষকতা একটি সাধারণ পেশার সীমা ছাড়িয়ে মানবিক দায়িত্বে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষক প্রতিদিন এমন দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। অনেক শিক্ষক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান। প্রতিকূল আবহাওয়া, যোগাযোগের সমস্যা কিংবা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান। কারণ তাঁদের কাছে একটি শ্রেণিকক্ষ মানে শুধু একটি ঘর নয়; সেখানে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা।

কেউ নিজের অর্থে শিক্ষার্থীর বই কিনে দেন, কেউ পরীক্ষার ফি পরিশোধে সহায়তা করেন, আবার কেউ ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসব কাজের অনেকটাই প্রচারের বাইরে থেকে যায়। অথচ নীরবে করা এসব মানবিক উদ্যোগই একটি সমাজকে এগিয়ে নেয়।

আজকের পৃথিবীতে শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, ইন্টারনেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে তথ্য এখন মানুষের হাতের নাগালে। একজন শিক্ষার্থী কয়েক মুহূর্তেই বিশ্বের নানা প্রান্তের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর সঠিক তথ্য চেনা এক বিষয় নয়। কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং কোন তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এগুলো বোঝার জন্য প্রয়োজন বিবেচনাবোধ ও নৈতিক শিক্ষা।

সেখানেই শিক্ষকের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানবিকতা শেখাতে পারে না। যন্ত্র উত্তর দিতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীকে নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে, অন্যের অনুভূতি বুঝতে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের বিকল্প নেই।

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে আরও ৪ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষক প্রয়োজন। অর্থাৎ শিক্ষক সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।

২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ বছর ১৯৬৬ সালের শিক্ষক মর্যাদা-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে। শিক্ষকতার পেশাকে সুরক্ষা দেওয়া, পেশাটির মর্যাদা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকা নিশ্চিত করার বিষয়টি তাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ছয় দশক পরও প্রশ্ন থেকে যায় শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা কি তাঁর দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? শিক্ষক কি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বাধীনতা পাচ্ছেন? তাঁর বেতন, কাজের চাপ ও কর্মপরিবেশ কি যথাযথ? যদি একজন শিক্ষককে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

শিক্ষককে সম্মান করার অর্থ শুধু শিক্ষক দিবসে ফুল দেওয়া নয়। তাঁর পেশাকে সম্মান করা, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্মান।

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তাঁর কোনো শিক্ষার্থী কত বড় কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী কিংবা বিখ্যাত ব্যক্তি হয়েছেন, তা নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তাঁর শিক্ষার্থী একজন ভালো মানুষ হয়েছে কি না। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় কি না, অসহায় মানুষের পাশে থাকে কি না, সত্যকে ভালোবাসে কি না এবং নিজের সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব বোঝে কি না সেখানেই একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য।

জীবনের অনেক বছর পরও আমরা কিছু শিক্ষকের কথা মনে রাখি। মনে পড়ে পুরোনো শ্রেণিকক্ষ, কাঠের বেঞ্চ, কালো বোর্ড আর হাতে চক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির কথা। হয়তো তিনি বলেছিলেন, ‘ভয় পেয়ো না।’ হয়তো বলেছিলেন, ‘ভুল হয়েছে, আবার চেষ্টা করো।’ কিংবা বলেছিলেন, ‘বড় মানুষ হওয়ার আগে ভালো মানুষ হও।’

এই কথাগুলো হয়তো কোনো পরীক্ষার প্রশ্নে আসেনি। কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় তার চেয়ে বড় শিক্ষা আর খুব বেশি নেই।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় ভবন, সড়ক, সেতু কিংবা অবকাঠামো দিয়ে মাপা যায় না। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষ কতটা জ্ঞানী, মানবিক, দায়িত্বশীল ও ন্যায়পরায়ণ হয়ে উঠছে তার ওপর। আর সেই মানুষ তৈরির অন্যতম কারিগর হলেন শিক্ষক।

শিক্ষকের হাতে শুধু বই-খাতা নয়, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ থাকে। তাঁর সামনে শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ নয়, থাকে একটি দেশের আগামী দিনের ছবি। তাঁর কথায় শুধু পাঠ থাকে না, থাকে মূল্যবোধ ও সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন।

তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও করতে হবে। এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষক নিজেই গর্ব করে বলতে পারেন ‘আমি শিক্ষক, আমি ভবিষ্যৎ গড়ি।’

কারণ একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর অসংখ্য নিবেদিত শিক্ষক বদলে দিতে পারেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ