পোল্যান্ড সীমান্তের পাশে স্থাপত্য, ইতিহাস, চলচ্চিত্র ও প্রকৃতির অনন্য মেলবন্ধন

গর্লিৎস: জার্মানির যে শহরে হাঁটলেই খুলে যায় ৯০০ বছরের ইতিহাসের দরজা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

জার্মানি বলতেই পর্যটকদের চোখে ভেসে ওঠে বার্লিনের আধুনিকতা, মিউনিখের ঐতিহ্য, ফ্রাঙ্কফুর্টের ব্যস্ত নগরজীবন কিংবা ড্রেসডেনের শিল্প-সংস্কৃতি। কিন্তু এসব পরিচিত গন্তব্যের বাইরে এমন কিছু শহর রয়েছে, যেখানে পর্যটকের অভিজ্ঞতা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইতিহাস, স্থাপত্য, পুরোনো ইউরোপীয় নগরজীবন এবং প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে চাইলে তেমনই একটি শহর গর্লিৎস।

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি রাজ্যে অবস্থিত গর্লিৎস দেশটির সবচেয়ে পূর্বের শহর। নেইসে নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহরটির অপর পাড়েই পোল্যান্ডের জগোরজেলিৎস। দুই শহর মিলে গড়ে উঠেছে একটি সীমান্তপারের ইউরোপীয় নগর-অভিজ্ঞতা। গর্লিৎসের ঐতিহাসিক শহরকেন্দ্রে এখনো মধ্যযুগ থেকে শুরু করে রেনেসাঁ, বারোক, উনিশ শতকের স্থাপত্য ও শিল্পনকশার অসংখ্য নিদর্শন টিকে আছে। শহরটির পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৪ হাজার ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে।

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যও গর্লিৎস হতে পারে জার্মানি ভ্রমণের একটি আলাদা অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যারা শুধু বড় শহরের আধুনিকতা নয়, ইউরোপের পুরোনো নগরসভ্যতা, স্থাপত্য ও ইতিহাস দেখতে চান, তাদের জন্য শহরটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।

গর্লিৎসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর পুরোনো শহর। পাথর বিছানো সরু রাস্তা, ঐতিহাসিক চত্বর, কারুকার্যময় ভবনের সম্মুখভাগ এবং পুরোনো গির্জা মিলিয়ে শহরের কেন্দ্র যেন একটি উন্মুক্ত স্থাপত্য জাদুঘর।

স্যাক্সনি পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গর্লিৎসের স্থাপত্যে প্রায় পাঁচ শতকের ইউরোপীয় স্থাপত্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। দেরি-গথিক, রেনেসাঁ, বারোক থেকে শুরু করে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ের স্থাপত্য ও শিল্পনকশা সবকিছুর উপস্থিতি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চোখে পড়ে।

শহরের পুরোনো অংশের অন্যতম আকর্ষণ উন্টারমার্কট। ঐতিহাসিক ভবনে ঘেরা এই চত্বরটি গর্লিৎসের নগরজীবনের অন্যতম কেন্দ্র। চারপাশের ভবনগুলোর সম্মুখভাগ, খিলান, জানালা, পুরোনো অলংকরণ এবং ঐতিহাসিক রাস্তার বিন্যাস পর্যটকদের কয়েক শতক আগের ইউরোপীয় শহরের পরিবেশ অনুভব করার সুযোগ দেয়।

এখানে হাঁটার সময় শুধু সামনের রাস্তা নয়, ভবনের ওপরের অংশের দিকেও চোখ রাখা জরুরি। কারণ গর্লিৎসের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর অলংকরণে রয়েছে বিভিন্ন যুগের শিল্পরীতির ছাপ। শহরের পর্যটন কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, দেরি-গথিক, রেনেসাঁ ও বারোক যুগের কারুকার্যময় প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে রঙিন কাঠের ছাদ ও অলংকৃত অভ্যন্তরীণ নকশা সবই শহরের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ।

গর্লিৎস ভ্রমণে সেন্ট পিটার অ্যান্ড পল চার্চ বা সেন্ট পিটার্স চার্চ বিশেষভাবে দেখার মতো। নেইসে উপত্যকার ওপর উঁচু অবস্থানে থাকা এই গির্জার বর্তমান ভবনটি মূলত পঞ্চদশ শতকের স্থাপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর পূর্বসূরি হিসেবে ত্রয়োদশ শতকের একটি গির্জার উল্লেখ পাওয়া যায়।

গর্লিৎস পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এটি স্যাক্সনির সবচেয়ে বড় হল-ধরনের গির্জাগুলোর একটি। গির্জাটির ভেতরে ১৭০৩ সালে নির্মিত সান অর্গান বা ‘সোনেনঅর্গেল’ও বিশেষ আকর্ষণ। এর অর্গান-সজ্জায় সূর্যের প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে।

গির্জাটির অবস্থানও পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। পুরোনো শহরের ওপর থেকে এর স্থাপত্য যেমন দৃশ্যমান, তেমনি এখান থেকে শহরের ঐতিহাসিক অংশ ও আশপাশের দৃশ্য দেখার সুযোগ রয়েছে।

গর্লিৎসের স্থাপত্যের পেছনে শুধু শিল্পীদের অবদান নয়, রয়েছে বাণিজ্যের দীর্ঘ ইতিহাস। মধ্যযুগে শহরটি ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ভিয়া রেজিয়া-র সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই পথ পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল।

শহরের ইতিহাসবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, গর্লিৎসের অবস্থান ছিল এমন একটি বাণিজ্যিক অঞ্চলে, যেখানে পশ্চিমে স্যাক্সনি ও থুরিঙ্গিয়া এবং পূর্বে সিলেশিয়া, বোহেমিয়া ও পোল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে শহরে আসেন কারিগর, ব্যবসায়ী ও স্থপতিরা। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ নগর স্থাপত্য।

বিশেষ করে কাপড় ও রং তৈরির ব্যবসা গর্লিৎসের অর্থনৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ষোড়শ শতকে শহরটি একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেই সময়ের অর্থনৈতিক শক্তির ছাপ আজও শহরের পুরোনো ভবনগুলোতে দেখা যায়।

গর্লিৎসের ঐতিহাসিক সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র ব্যাপক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ফলে মধ্যযুগীয় রাস্তার বিন্যাস ও বিভিন্ন সময়ের ভবনের একটি বড় অংশ টিকে যায়।

শহরের ইতিহাসবিষয়ক সূত্রগুলো বলছে, ১৯৪৫ সালে গর্লিৎস বিভক্ত হয়ে নেইসে নদীর দুই পাশে জার্মান গর্লিৎস ও পোলিশ জগোরজেলিৎসে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে দুই পাশের শহরের মধ্যে সীমান্তপারের যোগাযোগ নতুন মাত্রা পায়। ১৯৯৮ সালে গর্লিৎস-জগোরজেলিৎসকে ইউরোপীয় শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এই বিভক্ত ইতিহাস আজকের পর্যটকদের জন্যও বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একই নদীর দুই পাশে দাঁড়িয়ে পর্যটক একসঙ্গে জার্মানি ও পোল্যান্ডের নগরজীবনের স্বাদ নিতে পারেন।

গর্লিৎসের আরেকটি পরিচয় ‘গর্লিউড’। শহরের পুরোনো ভবন, রাস্তা ও চত্বর এতটাই অক্ষত ও বৈচিত্র্যময় যে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণীয় স্থান।

শহরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকেই গর্লিৎস চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এখানে শতাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ হয়েছে বলে পর্যটন কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে।

‘দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল’, ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’, ‘দ্য রিডার’ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে গর্লিৎসে। শহরের উন্টারমার্কটসহ পুরোনো অংশকে কখনো ইউরোপের অন্য শহর, কখনো ঐতিহাসিক কোনো নগর, আবার কখনো সম্পূর্ণ কাল্পনিক শহরের রূপ দেওয়া হয়েছে।

চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য তাই গর্লিৎস শুধু দর্শনীয় স্থান নয়; এটি সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে বাস্তব শহরের মিল খুঁজে দেখারও সুযোগ।

গর্লিৎসে শুধু গির্জা বা নাগরিক ভবন নয়, রয়েছে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাও। এর মধ্যে হেইলিগেস গ্রাব বা ‘পবিত্র সমাধি’ কমপ্লেক্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পঞ্চদশ শতকে নির্মিত এই স্থাপনাটি জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর আদলে তৈরি এবং শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

এ ছাড়া শহরের ইহুদি ঐতিহ্যের সঙ্গেও পর্যটকরা পরিচিত হতে পারেন। গর্লিৎসের উপাসনালয় ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা শহরটির বহুমাত্রিক সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। উনিশ শতকের শিল্পায়নের সময় গড়ে ওঠা শহরের নতুন অংশে আবার পাওয়া যায় গ্রুন্ডারজাইট ও জুগেন্ডস্টাইল স্থাপত্যের দীর্ঘ সারি।

ইতিহাস ও স্থাপত্য দেখার পর প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চাইলে গর্লিৎসের কাছে বেরৎসডর্ফ হ্রদ যেতে পারেন। শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই হ্রদে সাঁতার, নৌভ্রমণ, সাইকেল চালানো কিংবা অবসর সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে।

গর্লিৎসের সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটি শহরের পুরোনো অংশ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং এখানে একাধিক সৈকত রয়েছে।

ফলে একই দিনে ইতিহাস ও স্থাপত্যের পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাদ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। গ্রীষ্মকালে হ্রদের তীর বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হলেও বছরের অন্য সময়েও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করা যায়।

ড্রেসডেন থেকে গর্লিৎসে যাওয়া পর্যটকদের জন্য এক দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করা সম্ভব। তবে শহরের ঐতিহাসিক চরিত্র গভীরভাবে অনুভব করতে চাইলে শুধু দ্রুত দর্শনীয় স্থান দেখে ফিরে আসার পরিবর্তে কিছুটা সময় নিয়ে হাঁটা বেশি উপযোগী।

সকালে পুরোনো শহর থেকে হাঁটা শুরু করে উন্টারমার্কট, ঐতিহাসিক গলিপথ, সেন্ট পিটার্স চার্চসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো দেখা যেতে পারে। এরপর স্থানীয় ক্যাফে বা রেস্তোরাঁয় খাবার খেয়ে বিকেলে শহরের অন্য ঐতিহাসিক অংশ ঘুরে দেখা যায়। সময় থাকলে বেরৎসডর্ফ হ্রদে যাওয়া যেতে পারে।

গর্লিৎসের সরকারি পর্যটন তথ্যেও শহরটি ঘুরে দেখার জন্য হাঁটাভিত্তিক ভ্রমণ, শহরভ্রমণ, জাদুঘর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং খাবারের অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জার্মানিতে প্রথমবার ভ্রমণকারী বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকেই সাধারণত বার্লিন, মিউনিখ, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ বা ড্রেসডেনের মতো পরিচিত শহরকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু ইউরোপের পুরোনো নগরজীবনের স্বাদ নিতে চাইলে গর্লিৎস ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

এখানে বড় শহরের ব্যস্ততা তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হলেও ইতিহাসের উপস্থিতি অত্যন্ত ঘন। কয়েকশ মিটার হাঁটার মধ্যেই বিভিন্ন শতাব্দীর স্থাপত্য দেখা যায়। কোথাও গথিক গির্জা, কোথাও রেনেসাঁ ভবন, কোথাও বারোক অলংকরণ, আবার কোথাও উনিশ শতকের জুগেন্ডস্টাইল স্থাপত্য একটি শহরের মধ্যে এত বৈচিত্র্যই গর্লিৎসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সবচেয়ে বড় কথা, গর্লিৎস কেবল একটি সুন্দর শহর নয়। এটি মধ্যযুগীয় বাণিজ্য, ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন, জার্মানি-পোল্যান্ড সীমান্তের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্থাপত্য সংরক্ষণ এবং আধুনিক চলচ্চিত্র সবকিছুর মিলনস্থল।

তাই জার্মানি ভ্রমণের পরিকল্পনায় শুধু পরিচিত বড় শহরগুলোকেই তালিকায় না রেখে গর্লিৎসকে রাখলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ হতে পারে এক ভিন্ন মাত্রা। পাথর বিছানো পুরোনো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এখানে যেমন কয়েক শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়া যায়, তেমনি চলচ্চিত্রের পরিচিত দৃশ্য, সীমান্তের ওপারে পোল্যান্ডের শহর এবং কাছের হ্রদের প্রকৃতিও এক ভ্রমণেই উপভোগ করা সম্ভব।

গর্লিৎস যেখানে একটি শহরের রাস্তা, ভবন আর চত্বরই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের জীবন্ত পাতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ