মানুষের চোখে আকাশের তারা ছিল হাজার বছর ধরে বিস্ময়ের বিষয়। রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র, চাঁদ ও গ্রহকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ ছিল না। প্রাচীন সভ্যতার মানুষ খালি চোখে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে সময়, ঋতু ও দিক নির্ণয় করেছে। বিজ্ঞানীরা পরে টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাকাশের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একসময় পর্যন্ত মহাকাশ ছিল মূলত পর্যবেক্ষণের বিষয়। মানুষ তখনো পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশে নিজের তৈরি কোনো বস্তু পাঠাতে পারেনি।
এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। ওই দিন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে সফলভাবে পাঠায় স্পুটনিক-১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহ। মাত্র একটি ছোট ধাতব গোলক হলেও এর তাৎপর্য ছিল বিশাল। এটি ছিল মানুষের তৈরি প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ, যা পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে ঘুরতে সক্ষম হয়। সেই মুহূর্ত থেকেই কার্যত শুরু হয় মহাকাশযুগ
স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে মানুষ প্রথমবারের মতো পৃথিবীর বাইরে নিজের তৈরি একটি যন্ত্রকে মহাকাশে পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করে। এর প্রভাব শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যোগাযোগ, আবহাওয়া পূর্বাভাস, নৌ ও বিমান চলাচল, সামরিক প্রযুক্তি, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট ও বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশেও এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।
স্পুটনিক-১ দেখতে ছিল অনেকটা গোলাকার ধাতব বলের মতো। এর ভর ছিল প্রায় ৮৩ দশমিক ৬ কিলোগ্রাম। চারটি দীর্ঘ অ্যান্টেনার মাধ্যমে এটি বেতার সংকেত পাঠাত। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে সেই সংকেত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছিল।
এর উৎক্ষেপণ ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি কৃত্রিম বস্তুকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে কক্ষপথে স্থাপন করতে হলে নির্দিষ্ট গতিবেগ, উৎক্ষেপণ কোণ, রকেট প্রযুক্তি এবং সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রয়োজন। স্পুটনিক-১ সেই সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ দেয়।
উপগ্রহটি প্রায় ৯৬ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করত। অর্থাৎ প্রতিদিন বহুবার এটি পৃথিবীর ওপর দিয়ে অতিক্রম করত। তার বেতার সংকেত বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে বিস্ময় ও উদ্বেগ তৈরি করে।
১৯৫৭ সালের পৃথিবী ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের রাজনৈতিক উত্তেজনায় বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মহাকাশ।
স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের পর যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে যে মহাকাশ প্রযুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর পর দুই পরাশক্তির মধ্যে মহাকাশ অভিযানে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। শুরু হয় যাকে ইতিহাসে ‘মহাকাশ প্রতিযোগিতা’ বলা হয়।
এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালের নভেম্বরেই মহাকাশে পাঠায় স্পুটনিক-২, যাতে ছিল জীবন্ত প্রাণী কুকুর লাইকা। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথে যান। এর কয়েক বছর পর যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য গ্রহণ করে এবং ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানে নীল আর্মস্ট্রং ও এডউইন ‘বাজ’ অলড্রিন চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখেন।
অর্থাৎ ১৯৫৭ সালের সেই ছোট্ট উপগ্রহের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, মাত্র এক যুগের মধ্যেই তা মানুষকে পৃথিবীর বাইরে চাঁদের মাটিতে পৌঁছে দেয়।
স্পুটনিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলোর একটি ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষায় নতুন আগ্রহ তৈরি হওয়া। মহাকাশে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, প্রকৌশল, রসায়ন ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সমন্বয় প্রয়োজন ছিল।
ফলে মহাকাশ প্রতিযোগিতা শুধু রকেট বানানোর প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাও। বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ে। নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও মহাকাশচারী হয়ে ওঠার স্বপ্ন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মহাকাশ গবেষণার প্রয়োজন থেকেই ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্র, উন্নত কম্পিউটার, যোগাযোগপ্রযুক্তি, উপাদানবিজ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় নানা অগ্রগতি ঘটে। এসব প্রযুক্তির অনেকগুলো পরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ব্যবহৃত হয়েছে।
আজ আমরা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে কথা বলি, ছবি পাঠাই, সরাসরি সম্প্রচার দেখি কিংবা বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় করি। এর পেছনে কৃত্রিম উপগ্রহের অবদান অপরিসীম।
টেলিযোগাযোগ উপগ্রহের মাধ্যমে দূরদূরান্তে টেলিভিশন সম্প্রচার, টেলিফোন যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান সহজ হয়েছে। আবহাওয়া উপগ্রহ ঝড়, ঘূর্ণিঝড় ও বৃষ্টিপাতের গতিপথ পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহ কৃষি, বন, নদী, সমুদ্র ও পরিবেশের পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য দেয়।
আর বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা বা জিপিএসের মতো প্রযুক্তি আজ পরিবহন, নৌযান, বিমান চলাচল, জরুরি সেবা এবং ব্যক্তিগত নেভিগেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এক অর্থে বলা যায়, স্পুটনিক-১ শুধু মহাকাশে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেনি; এটি পৃথিবীকেও নতুনভাবে দেখতে শেখানোর পথ তৈরি করেছে।
মহাকাশ গবেষণা অনেক দূরের কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য কৃত্রিম উপগ্রহের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে উপগ্রহচিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষিজমির অবস্থা, ফসলের বৃদ্ধি, জলাশয়ের পরিবর্তন এবং বনভূমির ওপর নজর রাখতেও মহাকাশভিত্তিক তথ্য ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিজস্ব যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মহাকাশ প্রযুক্তি এখন কেবল বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশের বিষয় নয়; উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি অর্থনীতি, যোগাযোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
স্পুটনিক-১-এর সময় মানুষের প্রধান লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে একটি কৃত্রিম বস্তুকে স্থাপন করা। আজ মানুষের লক্ষ্য অনেক বিস্তৃত। চাঁদে আবার মানুষ পাঠানো, মঙ্গল গ্রহে অনুসন্ধান, গ্রহাণু গবেষণা, দূরবর্তী গ্রহের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ এবং মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ সবই আধুনিক মহাকাশ গবেষণার অংশ।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণও মহাকাশ খাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট, ছোট উপগ্রহ, মহাকাশ পর্যটন এবং বাণিজ্যিক মহাকাশযাত্রা একসময় কল্পবিজ্ঞানের বিষয় মনে হলেও এখন তা বাস্তব গবেষণার অংশ।
তবে মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ছে। পৃথিবীর কক্ষপথে বিপুলসংখ্যক কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশযান ঘুরছে। এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে মহাকাশের আবর্জনা বা ‘স্পেস ডেব্রিস’। ভবিষ্যতে নিরাপদ ও টেকসই মহাকাশ ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর স্পুটনিক-১ যখন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছিল, তখন তার পাঠানো বেতার সংকেত ছিল অত্যন্ত সরল। কিন্তু সেই সংকেতের ঐতিহাসিক অর্থ ছিল অসাধারণ। একটি ছোট যন্ত্রের ‘বিপ-বিপ’ শব্দ যেন মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিল পৃথিবীর সীমানা আর মানুষের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার শেষ সীমা নয়।
আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে সেই সংকেত যে যাত্রার সূচনা করেছিল, তা এখন চাঁদ, মঙ্গল ও গভীর মহাকাশের দিকে এগিয়ে চলেছে। মানুষের কৌতূহল, জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে মহাকাশকে গবেষণার নতুন ক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
৪ অক্টোবর তাই শুধু একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের তারিখ নয়; এটি মানুষের মহাকাশে প্রবেশের প্রতীক। স্পুটনিক-১ ছিল আকারে ছোট, কিন্তু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল বিশাল। সেই ছোট্ট উপগ্রহই পৃথিবীর মানুষকে দেখিয়েছিল আকাশ আর কেবল দূর থেকে দেখার বিষয় নয়; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শক্তিতে মানুষ একদিন সেখানে পৌঁছাতেও পারে। আজকের মহাকাশযুগের ভিত্তিতে তাই ১৯৫৭ সালের সেই অক্টোবরের দিনটি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।