বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা। নতুন বিধিনিষেধ জারির আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা সুতা ছাড় করাতেও কাস্টমস কর্মকর্তারা ব্যাংক গ্যারান্টি দাবি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। এতে সময়মতো কারখানায় সুতা পৌঁছাচ্ছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার উৎপাদন।
খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক উদ্যোক্তা জানান, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী নতুন কোনো বিধিনিষেধ জারির আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা পণ্যে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এবার সেই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে আগের ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা সুতা বন্দরে আটকে যাচ্ছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর দেশের বস্ত্রকলকে সুরক্ষা দিতে বন্ড সুবিধায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানির সুবিধা বাতিল করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিতের অনুরোধ জানালেও এখনো তা বহাল রয়েছে।
বিজিএমইএর পরিচালক নাফিস-উদ-দৌলা বলেন, নতুন আদেশ জারির আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে সুতা আমদানি করা হলেও কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্যের বিল অব ল্যাডিংয়ের সময়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব সুতা ছাড় করাতে ব্যাংক গ্যারান্টি চাওয়া হচ্ছে। ফলে কিছু তৈরি পোশাক কারখানার আমদানি করা সুতা বন্দরে আটকে রয়েছে।
এতে একদিকে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এনবিআরের আদেশে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানির সুবিধা থাকবে না। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানি করতে পারবেন। ওই সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হবে।
আদেশে বলা হয়, বস্ত্র খাতের সমস্যা পর্যালোচনা ও সমাধানের জন্য গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির ২০ আগস্টের সভায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার এবং ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পোশাকশিল্পের দুটি সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
এনবিআরের আদেশ জারির পর বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। সেখানে তাঁরা জানান, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি বন্ধের বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই তাঁরা আদেশটি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর এনবিআরকে চিঠি দিয়ে আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিতের অনুরোধ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়নি। এনবিআর জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে তারা। তাঁর মতে, সমস্যাটির দ্রুত সমাধান না হলে রপ্তানি কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, এনবিআরের আদেশের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য আমদানি করা সুতা ছাড় করতে সমস্যা হচ্ছে। এতে রপ্তানি কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা নিয়ে জটিলতা তৈরির পর দেশীয় সুতার চাহিদা কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কোনো কোনো স্পিনিং মিল নতুন করে ক্রয়াদেশও পাচ্ছে।
তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানির সুযোগ সীমিত হওয়ার পর স্থানীয় সুতার দামও বেড়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতি কেজি সুতার দাম ২০ থেকে ৩০ সেন্ট পর্যন্ত বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতার দাম ছিল প্রতি কেজি ৩ ডলার ১৫ সেন্ট থেকে ৩ ডলার ২০ সেন্ট। বর্তমানে তা বেড়ে ৩ ডলার ৩০ সেন্ট থেকে ৩ ডলার ৪০ সেন্টে উঠেছে। একপর্যায়ে দাম সাড়ে ৩ ডলার পর্যন্তও উঠেছিল।
মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি স্থগিত হওয়ার পর তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সুতা বিক্রি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। এ স্থগিতাদেশ অব্যাহত থাকলে বিক্রি আরও বাড়তে পারে।
তবে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার বলেন, এখনো সুতার ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। তবে বিভিন্ন পোশাক কারখানা ও বিদেশি ক্রেতাদের অনুসন্ধান বেড়েছে। এত দিন যারা দেশীয় সুতা ব্যবহার করেনি, তাদের কেউ কেউ এখন স্থানীয় মিলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিলের সংখ্যা ৫২৭টি। এ খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
দেশীয় বস্ত্রকলগুলো নিট পোশাকশিল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকশিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করে।
তবে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, স্থানীয় বস্ত্রকলের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের সুতা সব সময় চাহিদামতো পাওয়া যায় না। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মান, কাউন্ট ও পরিমাণের সুতা প্রয়োজন হলে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতার ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী কারখানার উৎপাদন ও পূর্বনির্ধারিত রপ্তানি আদেশের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান বলেন, এনবিআরের আদেশের আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা সুতা খালাসে পোশাকশিল্পের মালিকেরা সমস্যায় পড়ছেন। তাঁর অভিযোগ, এনবিআরের আদেশের ব্যাখ্যার কারণে কাস্টমস পর্যায়ে এ জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবি, নতুন বিধিনিষেধের আগে খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি করা পণ্য দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা করা হলে চলমান জটিলতা অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের অবস্থান দ্রুত স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে আমদানি করা সুতা ছাড়ের জটিলতা দ্রুত নিরসন না হলে কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা, সরবরাহব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।