পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাস: একদিন কি বিলুপ্ত হবে মানবসভ্যতাও?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর। এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি বদলেছে, মহাদেশের জন্ম হয়েছে, সমুদ্রে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে, ডাইনোসর এসেছে, আবার বিলুপ্তও হয়েছে। একসময় পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করা বিশাল প্রাণীগুলোর অধিকাংশই আজ কেবল জীবাশ্মের স্মৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পরিচিত মানুষও কি একদিন ডাইনোসরদের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, কোনো প্রজাতিই চিরস্থায়ী নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্তত পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে, যাতে বিপুলসংখ্যক প্রজাতি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তবে মানুষ ঠিক কবে বা কীভাবে বিলুপ্ত হবে, তা নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

পৃথিবীর ইতিহাসকে যদি কয়েক মিনিটের একটি চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের পরিচিত মানবসভ্যতার সময়টুকু হবে সেই চলচ্চিত্রের একেবারে শেষ মুহূর্তের ক্ষুদ্র অংশ। আর সেই ক্ষুদ্র সময়েই মানুষ এমন সব প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা পৃথিবীর পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।

বিজ্ঞানীদের হিসাবে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর। শুরুতে পৃথিবী ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। মহাকাশ থেকে গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের আঘাত, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগেরও হতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে প্রথম প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল, তা এখনো গবেষণার বিষয়।

পৃথিবীর এই দীর্ঘ ইতিহাসকে কয়েক মিনিটে কল্পনা করলে সময়ের বিস্ময়কর ব্যবধানটি স্পষ্ট হয়। পৃথিবীর বয়সকে যদি ২৪ ঘণ্টার একটি দিনে রূপান্তর করা হয়, তাহলে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটবে দিনের একেবারে শেষ মুহূর্তে। আমেরিকান প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের একটি সময়রেখায় পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসকে ১২ ঘণ্টায় সংকুচিত করে দেখানো হয়েছে; সেখানে আধুনিক মানুষের আবির্ভাবকে মধ্যরাতের মাত্র এক মিনিট আগে স্থান দেওয়া হয়েছে।

এই সময়রেখায় মানুষের অবস্থান কতটা সাম্প্রতিক, তা বুঝতে ডাইনোসরদের ইতিহাসের দিকে তাকালেই যথেষ্ট।

প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব ঘটে। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে একটি বিশাল গ্রহাণু বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে আঘাত হানে। এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিবেশগত পরিবর্তন পৃথিবীর বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করে। বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। অ-পক্ষী ডাইনোসররাও সেই বিলুপ্তির শিকার হয়। তবে ডাইনোসরদের একটি বিবর্তিত শাখা পাখি এখনো পৃথিবীতে টিকে আছে।

এই ঘটনা মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা বহন করে। কোনো প্রজাতি দীর্ঘদিন পৃথিবীতে টিকে থাকলেই যে ভবিষ্যতের সব বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। পরিবেশ দ্রুত বদলে গেলে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে, আবাসস্থল ধ্বংস হতে পারে এবং বেঁচে থাকার উপযোগী পরিস্থিতি হারিয়ে যেতে পারে।

আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের অস্তিত্বের বয়স প্রায় তিন লাখ বছর। এই সময়ের মধ্যে মানুষ কৃষি, নগরসভ্যতা, শিল্পবিপ্লব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে। কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ডই এখন পৃথিবীর বহু প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থলভাগ, মিঠাপানি ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে জীববৈচিত্র্য হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাপপ্রবাহ, বন্যা, উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তবে এসব ঝুঁকিকে মানুষের অবধারিত বিলুপ্তির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য সংকট গুরুতর হলেও মানুষের অভিযোজনক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর নীতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ রয়েছে।

মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে না। পারমাণবিক যুদ্ধ, ভয়াবহ মহামারি, বড় ধরনের গ্রহাণুর আঘাত এবং নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে এসব ঝুঁকির মাত্রা এক নয়; কোনো কোনো ঘটনা সভ্যতাকে বিপর্যস্ত করতে পারে, আবার কোনোটি মানুষের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গ্রহাণুর আঘাতের ক্ষেত্রেও আতঙ্কের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০০ বছর বা তারও বেশি সময়ের মধ্যে ব্যাপক ধ্বংস ঘটাতে সক্ষম কোনো গ্রহাণুর পৃথিবীতে আঘাত হানার আশঙ্কা অত্যন্ত কম বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এ ধরনের মহাজাগতিক বস্তুর গতিপথ পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য বিপদ শনাক্ত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাস দেখায়, প্রাণের বিকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি অসংখ্য প্রজাতির বিলুপ্তিও ঘটেছে। ভবিষ্যতে কোনো একসময় মানুষ বিলুপ্ত হবে কি না, তার নির্ভরযোগ্য সময়সীমা বিজ্ঞানীদের জানা নেই। এমনকি মানুষ বিলুপ্ত হলেও পৃথিবীর সব প্রাণ একসঙ্গে বিলুপ্ত হবে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানোর কারণ নেই।

প্রশ্নটি তাই শুধু মানুষ একদিন হারিয়ে যাবে কি না, তা নয়; বরং মানুষের কর্মকাণ্ড পৃথিবীকে কতটা বাসযোগ্য রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের হাতে রয়েছে বিপর্যয় ডেকে আনার ক্ষমতা, আবার সেই বিপর্যয় ঠেকানোর জ্ঞান ও প্রযুক্তিও।

৪৫০ কোটি বছরের পৃথিবীর ইতিহাস কয়েক মিনিটে কল্পনা করলে বোঝা যায়, মহাবিশ্বের বিশাল সময়ের তুলনায় মানবজাতির অস্তিত্ব অত্যন্ত ক্ষুদ্র। ডাইনোসরদের বিলুপ্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীতে টিকে থাকার কোনো চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ এখনো লেখা হয়ে যায়নি। পরিবেশ রক্ষা, যুদ্ধের ঝুঁকি হ্রাস, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের পৃথিবী কতটা নিরাপদ থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ