সার্বভৌমত্ব, স্বনির্ভর অর্থনীতি ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আলোচনায় বুরকিনা ফাসোর সামরিক শাসক

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, ফরাসি প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। তাঁর নেতৃত্বে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা এবং স্বর্ণ পরিশোধনসহ স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ পশ্চিম আফ্রিকায় ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে ত্রাওরে একাই পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছেন এমন বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত। বাস্তবে তাঁর উত্থান আফ্রিকায় বিদেশি প্রভাব, সামরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের অংশ।
১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া ইব্রাহিম ত্রাওরে বুরকিনা ফাসোর সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সে সময় দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল।
ক্ষমতায় আসার পর ত্রাওরে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আত্মনির্ভরতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। দেশটির সাবেক নেতা টমাস সাংকারার বিপ্লবী ও স্বনির্ভরতার আদর্শও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অবস্থানের কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিদেশি আধিপত্যবিরোধী মনোভাবাপন্ন মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
ত্রাওরের নেতৃত্বে বুরকিনা ফাসোর পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ফ্রান্সের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্যোগ। ২০২৩ সালে দেশটি থেকে ফরাসি সেনা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৬ জুন বুরকিনা ফাসো সরকার ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। দেশটির সরকার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলে। ফ্রান্স এসব অভিযোগের বিরোধিতা করেছে।
একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে বুরকিনা ফাসো। মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতাকে দেশটির সরকার বিকল্প অংশীদারত্ব হিসেবে তুলে ধরছে। তবে ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সমতুল্য নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বুরকিনা ফাসোর অবস্থানকে বরং অংশীদার পরিবর্তন ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
ত্রাওরের অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য সংযোজন নিজ ভূখণ্ডে নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানী ওয়াগাদুগুতে দেশটির প্রথম জাতীয় স্বর্ণ পরিশোধনাগার উদ্বোধন করা হয়। ‘রাফিনর-বিএফ’ নামের এই প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে বছরে ১৬৪ টন স্বর্ণ পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। ভবিষ্যতে সক্ষমতা বাড়িয়ে ৫১৫ টনে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বুরকিনা ফাসোর স্বর্ণ উৎপাদন ৯৪ টনের বেশি ছিল। সরকার কৃষি, বস্ত্রশিল্প, খনিজ সম্পদের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য বিদেশে কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে দেশের ভেতরেই উৎপাদিত সম্পদের মূল্য বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধি করা।
তবে নতুন পরিশোধনাগারের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো, পর্যাপ্ত স্বর্ণ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ। কারখানা স্থাপন করলেই অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত হবে না; উৎপাদন, বিপণন ও রাজস্ব বণ্টনে কার্যকর ফলাফলও প্রয়োজন।
ত্রাওরের জনপ্রিয়তা বাড়লেও তাঁর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা পরিস্থিতি। এক দশকের বেশি সময় ধরে বুরকিনা ফাসো আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার মুখে রয়েছে। এসব হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সামরিক অভিযান জোরদার করা হলেও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে সামরিক বাহিনী ও সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যাসহ গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়নের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ দেশটির সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ত্রাওরে গণতন্ত্রের প্রচলিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর সরকারের অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বেসামরিক শাসনে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নও সামনে এসেছে
ত্রাওরের উত্থানকে শুধু একজন নেতার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। সাহেল অঞ্চলের কয়েকটি দেশ ফরাসি প্রভাব থেকে দূরে সরে রাশিয়াসহ বিকল্প অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং বিদেশি সামরিক সহযোগিতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ত্রাওরের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে আফ্রিকার তরুণদের একটি অংশের কাছে পরিচিত প্রতীকে পরিণত করেছে। কিন্তু তাঁর সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতা দিয়ে নয়; বরং সশস্ত্র সহিংসতা কমানো, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবাধিকার রক্ষার মাধ্যমে।
সব মিলিয়ে, ইব্রাহিম ত্রাওরে পশ্চিম আফ্রিকায় ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিদেশি প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং স্বর্ণ পরিশোধনাগার প্রতিষ্ঠা তাঁর নীতির দৃশ্যমান উদাহরণ। তবে বুরকিনা ফাসোর নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই হবে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ