কেয়ামতের প্রস্তুতি ইরানের! নতুন হামলা হলে ভয়াবহ পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকির পর তেহরানও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। ইরানের বক্তব্য, দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর নতুন করে আঘাত এলে তার জবাব দেওয়া হবে। ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে শান্তির পথে ফেরার পরিবর্তে অঞ্চলটি আবারও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ছে।
২৪ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলা হলে ইরান আগের মতো সীমিত প্রতিক্রিয়ায় আটকে থাকবে না। তবে নতুন হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লেও আসন্ন হামলাকে অবশ্যম্ভাবী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইরানকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিও এর ধাক্কা অনুভব করতে পারে।
হুমকির মুখে তেহরানের কঠোর অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাম্প্রতিক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, আগের সংঘাতের পরও ইরান টিকে আছে এবং নতুন আক্রমণ হলে তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। ইরানের নেতৃত্বের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সামরিক চাপের মুখে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে তারা ছাড় দিতে আগ্রহী নয়। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবে সামরিক সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র এক বিষয় নয়।
ইরানের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দ্বন্দ্ব, নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার প্রচেষ্টা। তেহরানের দৃষ্টিতে, বিদেশি সামরিক হামলার মুখে নতি স্বীকার করলে তার প্রতিরক্ষা কৌশল ও আঞ্চলিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগকে সামরিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দুই পক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবস্থান পরস্পরবিরোধী হওয়ায় সমঝোতার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান: ইরানের প্রতিরোধের প্রধান ভরসা
ইরানের সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন আকাশযান এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা। দেশটি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একমুখী আক্রমণকারী আকাশযান তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা শাখার ২০ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশযান কর্মসূচির বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরানের অবশিষ্ট সক্ষমতা এবং পুনর্গঠনের অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
ইরানের সামরিক শক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাই দুটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, দেশটির অস্ত্রভান্ডার ও আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং পাল্টা হামলার শক্তি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশযান যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনা এবং মিত্রদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই সক্ষমতা থাকলেই ইরান সব ধরনের হামলা ঠেকাতে পারবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ফলে ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল বা অজেয় কোনোটিই ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। দেশটি আগে থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তুলেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, ধারাবাহিক হামলায় অস্ত্র উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও সামরিক ঘাঁটির ক্ষতি হলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালি: সংঘাতের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক জলপথে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নৌচলাচল ব্যাহত হলে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রভাবিত হতে পারে।
২৪ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ইরান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার অবস্থান নেওয়ায় সমঝোতার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এখানে কূটনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত হওয়া দেশটির রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও চায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকুক এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যাচাইযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হোক। দুই পক্ষের লক্ষ্য পূরণে সমঝোতা না হওয়ায় সামরিক চাপ ও পাল্টা হুমকির পরিবেশ বজায় রয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা শাখার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বর্তমান অবস্থা পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন। সামরিক হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এবং কর্মসূচির প্রকৃত অগ্রগতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শন ও যাচাইয়ের কার্যক্রমও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে শুধু সামরিক হামলা চালিয়ে পারমাণবিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হামলায় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি, যাচাইযোগ্য সমঝোতা এবং দুই পক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান। কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে একই বিরোধ নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বিপদ বাড়বে পুরো অঞ্চলে
ইরানে নতুন করে হামলা হলে তার জবাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এই সংঘাতের সঙ্গে জড়িত। ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকার কারণে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশযানের পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোও মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্যও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয়, তেলের সরবরাহ কতটা ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত সমাধান কি যুদ্ধ, নাকি কূটনীতি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জন্য ইরানে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত সামরিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকে জটিল করতে পারে। আবার ইরানও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার পরিণতি এড়িয়ে যেতে পারবে না।
তাই ‘ইরান প্রস্তুত’ এই বক্তব্যকে শুধু যুদ্ধের হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে প্রতিরোধের বার্তা, দর-কষাকষির কৌশল এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার অবস্থান প্রকাশের চেষ্টা। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকিও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির অংশ হতে পারে; তবে তা বাস্তব সামরিক পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।
ইরানকে আক্রমণ করলে ট্রাম্প যে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন, তার কারণ শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিণতি। অন্যদিকে, ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। নতুন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে, আর কার্যকর সমঝোতা উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। সামরিক শক্তির প্রদর্শন সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেললেও স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য আলোচনা, যাচাইযোগ্য চুক্তি এবং সংঘাত এড়ানোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ