যে নারীকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যের কাহিনি, তাঁর পরিবারের দারিদ্র্যই তুলে ধরে এক কঠিন প্রশ্ন
একটি ছোট্ট গ্রাম। অভাবের সংসার। বাঁশের তৈরি মোড়া বুনে জীবিকা নির্বাহ করা এক দরিদ্র নারী। হাতে পুঁজি নেই, অথচ শ্রম আছে; স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাঁশ কিনতে হয়, আর দিনভর পরিশ্রমের পর উৎপাদিত মোড়া বিক্রি করেও হাতে থাকে সামান্য অর্থ। বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্যের এমনই এক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুফিয়া বেগমের নাম।
চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামের এই নারীকে ঘিরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষুদ্রঋণের এক বহুল প্রচারিত কাহিনি। সেই কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দরিদ্র মানুষের জন্য জামানতবিহীন ঋণের ধারণা, গ্রামীণ ব্যাংকের বিকাশ এবং ক্ষুদ্রঋণের আন্তর্জাতিক প্রসারের ইতিহাসে তাঁর অবদান স্বীকৃত। ২০০৬ সালে তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
কিন্তু যে নারীর দারিদ্র্য ক্ষুদ্রঋণের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তাঁর নিজের জীবনের শেষ পরিণতি কী ছিল? তাঁর পরিবার কি সত্যিই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছিল? আর বিশ্বজুড়ে প্রচারিত সাফল্যের গল্পের পাশে সেই পরিবারের বাস্তব অবস্থান কতটা জায়গা পেয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে এক বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
প্রচারের আলোয় সাফল্য, বাস্তবে দারিদ্র্য
২০০৪ সালের ১৭ এপ্রিল দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সুফিয়া বেগমের বাঁশের মোড়া তৈরির কাজ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া এবং সামান্য মুনাফায় জীবিকা নির্বাহের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. ইউনূস তাঁর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন, পাঁচ টাকা ধার করে বাঁশ কিনে মোড়া তৈরির পর ঋণ শোধ করে তাঁর হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকত। এই অভিজ্ঞতা থেকেই দরিদ্র মানুষের জন্য ক্ষুদ্রঋণের সম্ভাবনা নিয়ে ইউনূসের চিন্তা এগিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে এই অভিজ্ঞতা ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কিন্তু সুফিয়া বেগমের জীবনকে শুধু একটি অর্থনৈতিক ধারণার সূচনা হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর বিডিনিউজ২৪ডটকম-এ প্রকাশিত একটি সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসে সেই অসমাপ্ত গল্পের অন্য দিক। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৬ সালে সুফিয়া খাতুন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের প্রাথমিক পর্যায়ে দুই কিস্তিতে মোট ৫৬০ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারের দারিদ্র্য কাটেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে তাঁর দুই মেয়ে হালিমা খাতুন ও নুরুননাহার বেগমের জীবনসংগ্রামের কথাও উঠে আসে। পরিবারের কৃষিজমি ছিল না; তাঁদের বসবাসের জন্য ছিল অল্প জায়গার একটি ঘর। সুফিয়ার ছোট মেয়ে নুরুননাহার সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন, তাঁর মা ক্ষুদ্রঋণের প্রথম দিকের ঋণগ্রহীতা হলেও তাঁদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।
এখানেই প্রশ্নটি গভীর হয়ে ওঠে। যে নারীর জীবনকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সম্ভাবনা বোঝাতে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাঁর নিজের পরিবার কেন সেই মুক্তির সুফল পেল না?
ঋণের টাকা কি বদলে দিয়েছিল তাঁর ভাগ্য?
সুফিয়া বেগমের জীবনের বহুল প্রচারিত বিবরণে ক্ষুদ্রঋণের একটি মৌলিক যুক্তি তুলে ধরা হয় অল্প পুঁজি পেলে দরিদ্র মানুষ নিজের শ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় বাড়াতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় এত সরল নয়। ঋণ ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে, আবার বাজারের সীমাবদ্ধতা, উৎপাদন ব্যয়, অনিশ্চিত আয় ও কিস্তির চাপের কারণে ঋণগ্রহীতা আরও সংকটেও পড়তে পারেন।
বিডিনিউজ২৪ডটকমের ২০১০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুফিয়া বেগমের বাঁশের আসবাব তৈরির উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি বলে তাঁর মেয়ে জানিয়েছিলেন। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁকে অন্য উৎস থেকেও টাকা ধার করতে হয়েছিল। এই বিবরণ ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য নিয়ে একপেশে ধারণার বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।
তবে সুফিয়া বেগমের ব্যক্তিগত ঋণের অভিজ্ঞতা দিয়ে সব ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতার পরিস্থিতি বিচার করা যায় না। একইভাবে ক্ষুদ্রঋণের আন্তর্জাতিক সাফল্যের দাবি দিয়েও প্রত্যেক ঋণগ্রহীতার দারিদ্র্য দূর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে দেখতে হবে, কতজন ঋণগ্রহীতার আয় বেড়েছে, কতজন ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে পারেননি, কত পরিবার স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং কত পরিবার আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
২০০৬ সালের অনুসন্ধান এবং যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে জোবরা গ্রামে গিয়ে সুফিয়া বেগমের জীবন নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। সেই অনুসন্ধানে তাঁর পরিবারের বাস্তব অবস্থা এবং প্রচলিত সাফল্যের গল্পের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গিয়েছিল বলে আপনি দাবি করছেন। এই অনুসন্ধানের মূল প্রতিবেদন, প্রকাশের তারিখ, প্রতিবেদকের পরিচয় এবং সাক্ষাৎকারের নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও নির্দিষ্টভাবে যাচাই করা সম্ভব।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সুফিয়া বেগম ও ক্ষুদ্রঋণের ইতিহাস নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৫ অক্টোবর ২০০৬-এর প্রতিবেদনে প্রথম দিকের ঋণগ্রহীতা হিসেবে মরিয়ম বিবির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে ২০১০ সালে বিডিনিউজ২৪ডটকম সরাসরি সুফিয়া বেগমের পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা প্রকাশ করে।
অর্থাৎ, সুফিয়া বেগমের পরিবারের দারিদ্র্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়নি এমন দাবি সঠিক নয়। বরং তাঁর পরিবারের দুরবস্থার কথা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যের বয়ানের পাশাপাশি কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল, সেটি একটি বৈধ অনুসন্ধানী প্রশ্ন।
আপনার বক্তব্যে আরও অভিযোগ রয়েছে, সুফিয়া বেগমের মৃত্যু ও পারিবারিক বাস্তবতা গোপন রাখা হয়েছিল এবং পরে বিপুল অর্থ ব্যয় করে আন্তর্জাতিক মাধ্যম থেকে সংশ্লিষ্ট তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য কিংবা প্রতিবেদন অপসারণের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড ছাড়া এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা গেলে তা গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হতে পারে। আর যাচাইয়ের আগে সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
নোবেলের আলোয় যে মুখটি আড়ালে পড়ে যায়
নোবেল শান্তি পুরস্কার একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু কোনো পুরস্কারই কোনো কর্মসূচির প্রতিটি ফলাফলকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো মডেল কতটা সফল, তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্য, গবেষণা ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
সুফিয়া বেগমের গল্প আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাঁর জীবনকে যদি শুধু একটি বৈশ্বিক সাফল্যের সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ, ব্যর্থ উদ্যোগ এবং পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা হারিয়ে যেতে পারে। আর যদি তাঁর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, তাহলে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে আরও গভীর ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা সম্ভব।
একজন দরিদ্র নারী ঋণ নিয়েছিলেন নিজের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার আশায়। সেই ঋণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি, একটি উন্নয়ন মডেলের প্রসার এবং নোবেল পুরস্কারজয়ী প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস। অথচ তাঁর পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই যাত্রার সুফল তাঁদের জীবনে পৌঁছায়নি।
এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে বেদনাদায়ক।
সুফিয়া বেগমের গল্পের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করতে হলে তাঁকে কোনো ব্যক্তির সাফল্যের প্রচারপত্র কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগের উপকরণ কোনোটিতেই সীমাবদ্ধ করা যাবে না। তাঁকে দেখতে হবে একজন মানুষ হিসেবে, যাঁর শ্রম ছিল, অভাব ছিল, আশা ছিল এবং ছিল নিজের জীবন বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তাঁর পরিবারের অভিজ্ঞতা যদি উন্নয়নের প্রচলিত বয়ানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। আর যদি কোনো তথ্য গোপন করা হয়ে থাকে, তার প্রমাণ সামনে আনতে হবে। কারণ মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে তৈরি কোনো গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারক পুরস্কার কমিটি নয়, প্রচারমাধ্যমও নয় সেই মানুষের জীবন এবং তাঁর পরিবারের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
সুফিয়া বেগমের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান হবে তাঁর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত প্রতিটি দাবির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তাঁর পরিবারের বক্তব্যের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা-দুই দিকই জনসমক্ষে তুলে ধরা।