সোহাগপুরের খেতাবপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনা নারীরা

যে মাটিতে নারীরা স্বজনের লাশ দাফন করেছিলেন, সেই বাংলাতেই আবার কবর খোঁড়ার আর্তনাদ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

কিছু দৃশ্য শুধু চোখে পানি আনে না, একটি জাতির বিবেককেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিছু ছবি কেবল একটি পরিবারের শোকের দলিল হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে একটি দেশের ইতিহাস, আত্মত্যাগ আর ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। পিরোজপুরে তিন নারীর কবর খোঁড়ার সেই দৃশ্যও তেমনই এক মর্মান্তিক ছবি যে ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাতে হয় ১৯৭১ সালের দিকে, ফিরে যেতে হয় শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সোহাগপুরে। সেখানে এক সকালে স্বামী হারিয়েছিলেন ৬৭ জন নারী। ভাই হারিয়েছিলেন কেউ, কেউ হারিয়েছিলেন সন্তান। আর স্বজনদের রক্তাক্ত দেহ মাটিচাপা দিতে শেষ পর্যন্ত কোদাল হাতে এগিয়ে এসেছিলেন সেই নারীরাই।

দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ইতিহাসের দুই প্রান্ত যেন এসে দাঁড়িয়েছে একই বিন্দুতে। একদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নৃশংসতার শিকার মানুষের স্মৃতি, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর দাফন ঘিরে তিন নারীর অসহায় সংগ্রামের অভিযোগ। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে রাষ্ট্রের পরিচয়। কিন্তু কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নারীর চোখের জল কি বদলেছে?

পিরোজপুরের ঘটনাটি নিয়ে ওঠা অভিযোগ, এর পেছনের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে ঘটনাটি যে প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং মৃত মানুষের মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা দায়িত্বশীল?

১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রাম। সকাল তখনো পুরোপুরি গড়িয়ে যায়নি। কৃষকেরা কেউ লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যাচ্ছিলেন, কেউ বাড়ির উঠানে কাজ করছিলেন, কেউ ধানখেতে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ খবর এল, গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর সদস্যদের সহযোগিতায় গ্রামটি ঘিরে ফেলল। শুরু হলো তল্লাশি। আর তারপরই নেমে এল এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।

মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে না পেয়ে নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল হানাদার বাহিনী। গুলিতে ঝাঁঝরা হলো একের পর এক মানুষের বুক। মুহূর্তে নিভে গেল কত সংসারের আলো। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সোহাগপুরে ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার ভয়াবহতার বিবরণ রয়েছে। মামলার নথিতে ১৮৭ জন নিহত হওয়ার তথ্যও এসেছে। সেই হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি আজও বহন করছে সোহাগপুরের মানুষ। গ্রামটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বিধবাপল্লি’ নামে।

একটি গ্রামের এতগুলো মানুষকে হারানোর পর স্বজনদের দাফন করবে কে? যাঁদের স্বামী, ভাই কিংবা সন্তানকে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের জীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় নির্যাতন, শেষ পর্যন্ত সেই নারীরাই এগিয়ে এসেছিলেন। কারও হাতে কলাপাতা, কারও হাতে ছেঁড়া কাপড়। স্বজনের নিথর দেহগুলো একত্র করে মাটির নিচে শুইয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। শোকের ভারে ভেঙে পড়ারও যেন অবকাশ ছিল না তাঁদের। কারণ, প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের দায়িত্বটুকু যে তাঁদেরই পালন করতে হবে।

ভাবা যায়, একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় লেখা আছে! যে নারীরা কয়েক ঘণ্টা আগেও স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সংসারের স্বপ্ন দেখছিলেন, তাঁদেরই হাতে উঠেছিল কবরের মাটি। সেই মাটির সঙ্গে চাপা পড়েছিল কত স্বপ্ন, কত ভালোবাসা, কত অনাগত দিনের প্রত্যাশা। কিন্তু চাপা পড়েনি ইতিহাস। চাপা পড়েনি অপরাধের স্মৃতি। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও সোহাগপুরের সেই কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কত মানুষের রক্ত আর অশ্রুর বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে।

আর সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়েই আজ পিরোজপুরের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর পিরোজপুরে দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাঁকে দাফন করা নিয়ে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং কবর খুঁড়ে রাখার পর তা মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয় এবং ২৫ অক্টোবর গভীর রাতে পারিবারিক বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, কয়েকজন নারী কবর খোঁড়ার কাজে হাত লাগিয়েছেন। ছবিটি মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকের মনে হয়েছে, ইতিহাস যেন আবার ফিরে এসেছে সেই একাত্তরের মতোই স্বজনের শেষ আশ্রয়ের জন্য নারীদের মাটি কাটতে হচ্ছে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। পরবর্তী কিছু সংবাদপ্রতিবেদনে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ও মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, কবর খোঁড়ার কাজে নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরাও অংশ নিয়েছিলেন। ফলে কেবল তিন নারীই কবর খুঁড়েছেন এমন দাবি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়। একইভাবে, কবর ভরাট করার ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা নিয়েও অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য রয়েছে। এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য উদ্‌ঘাটন করা প্রয়োজন।

কিন্তু ছবির প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই: একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর দাফন নিয়ে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে? যিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তাঁর শেষ বিদায় কেন রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়বে? একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, তাঁর সঙ্গে মতপার্থক্য যত গভীরই হোক, মৃত্যুর পর সম্মানজনক দাফনের অধিকার কি তাঁর থাকবে না?

একটি সভ্য রাষ্ট্রে একজন মৃত মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়; এটি মানবিকতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন। একজন মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও দাফন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের বাধা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি অতীত ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদার ভিত্তি। সেই যুদ্ধের অপরাধের বিচার, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীদের সম্মান রক্ষা করা মানে শুধু ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো নয়; বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও ন্যায়বিচারের মূল্য প্রতিষ্ঠা করা।

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই স্বাধীনতার পর জন্মেছে। তারা যুদ্ধ দেখেনি, সোহাগপুরের হত্যাযজ্ঞ দেখেনি, দেখেনি স্বজনের লাশের পাশে বসে থাকা বিধবাদের অসহায় চোখ। তাদের কাছে একাত্তর বইয়ের পাতা, স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা জাতীয় দিবসের বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের দায় কখনো শেষ হয়ে যায় না। সেই দায় বহন করতে হয় সত্যকে জানার মাধ্যমে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মর্যাদাকে স্বীকার করার মাধ্যমে।

কোনো রাজনৈতিক দলের সব সদস্যকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি কোনো দলের পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অভিযোগের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, অপরাধের বিচার হবে আইনে। কিন্তু ভিন্নমতের মানুষের প্রতি ঘৃণা, প্রতিশোধের হুমকি কিংবা সহিংসতার আহ্বান কখনোই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

সোহাগপুরের নারীরা তাঁদের স্বজনদের কবর দিয়েছিলেন অসহায় অবস্থায়। তাঁদের হাতে ছিল না ক্ষমতা, ছিল না অস্ত্র, ছিল না অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা। ছিল শুধু স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রিয়জনের শেষ দায়িত্বটুকু পালন করার দৃঢ়তা। তাঁদের সেই অসহায়ত্বই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়গুলোর একটি।

পিরোজপুরের তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবিও তাই কেবল একটি পরিবারের শোকের ছবি নয়। এটি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কিছু কঠিন প্রশ্ন। একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় কেন নির্বিঘ্ন হবে না? রাজনৈতিক মতভেদ কি মানুষের মৃত্যুর পরও তাঁর মর্যাদাকে বিপন্ন করবে? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কি কেবল স্মরণ করার জন্য, নাকি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য?

ছবিটি বাংলাদেশের ইতিহাস পাল্টে দেবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু ছবিটি যদি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, যদি মানুষকে ইতিহাসের সত্য জানতে উদ্বুদ্ধ করে, যদি প্রশাসনকে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে বাধ্য করে, যদি রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে শেখায় যে প্রতিপক্ষ হলেও মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হয় তাহলেই ছবিটি একটি বড় দায়িত্ব পালন করবে।

কারণ, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি শুধু একই ঘটনা আবার ঘটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে তখনই, যখন আমরা অতীতের অন্যায় থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হই; যখন ভুক্তভোগীর কান্না আমাদের কাছে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়; যখন একজন মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও নিরাপদ থাকে না।

সোহাগপুরের মাটিতে যে নারীরা স্বজনের কবর দিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো জানতেন না, তাঁদের সেই অসহায় মুহূর্ত একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। পিরোজপুরের ছবির নারীরাও হয়তো ভাবেননি, তাঁদের কবর খোঁড়ার দৃশ্য এত মানুষের মনে এত প্রশ্ন জাগাবে।

কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো এমন একটি ছবির মধ্য দিয়েই কথা বলে। সে ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্যবোধ রক্ষা করা কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর সেই মূল্যবোধের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।

একাত্তরের সোহাগপুর আমাদের শিখিয়েছে, নিষ্ঠুরতার মুখেও মানুষ তার প্রিয়জনকে পরিত্যাগ করে না। পিরোজপুরের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই মানবিকতার পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়নি।

কবরের মাটি একদিন শুকিয়ে যাবে। কান্নার শব্দও একসময় স্তব্ধ হবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যাবে। আর সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে আমাদেরই একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার দায় যাদের কাঁধে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ