বন্ধ হয়ে গেলো ঢাকার দুই দশক পুরোনো শপিং মল

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানীর এক সময়ের অভিজাত শপিং কমপ্লেক্স কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অবশেষে বন্ধ হয়ে গেলো। ব্যবসায়িক মন্দা, ক্রেতা সংকট আর বিপুল বকেয়া বিলের কারণে গত ১ অক্টোবর থেকে মার্কেটটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মূল ফটকের শাটার নামানো, ঝুলছে বন্ধের ব্যানার ‘১/১০/২০২৬ ইং তারিখ হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে’। 

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ১৯৯৮ সালে কর্ণফুলী গ্রুপের হাত ধরে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে যাত্রা শুরু করা ২০ তলা এই ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল শপিং মল, চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। চালুর সময় এখানে ১৯৮টি দোকান ছিল। তবে বন্ধের সময় ভেতরে মাত্র ১৭টি আর বাইরের রেস্তোরাঁ মিলে মোট ২৫টি দোকান খোলা ছিল।

মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকি বিল্লাহ ওসমানী আনন্দ শাহ বলেন, ‘এটি একদিনে হয়নি। বিগত এক দশকের অব্যবস্থাপনা, দেশের মন্দা পরিস্থিতি এবং ব্যবসা না থাকা সব মিলিয়েই এই পরিণতি।’

তিনি বলেন, ‘আসলে এটা তো একদিনে হয়নি ভাই, এটা বিগত এক দশকের অব্যবস্থাপনা বলেন বা দেশের মন্দা পরিস্থিতি বলেন, ব্যবসা না থাকা বলেন সবকিছু মিলায় এক দশক যাবত এটা চলছে। সর্বপ্রথম শুরু হয় আমাদের ফ্লাইওভারটা যখন হয়, এই যে শান্তিনগর তখন আসলে মার্কেটের কিছু প্রকৃত মালিক যারা দোকানদার তারা অন্য মার্কেটে শিফট হইছিল। যে মার্কেটটা যদি আবার চালু হয় বা রাস্তাঘাট ভালো হয় তখন আবার রিটার্ন আসবে। সেসব তখন থেকে আসলে শুরু দুঃসময়টা মার্কেটের, সেটা মনে করেন ১৬-১৭ থেকে।’

তার ভাষ্যমতে, ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় ক্রেতা কমে যায়। ভালো ব্যবসায়ীরা অন্য মার্কেটে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। পরে কোভিড মহামারি সেই ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ‘তারপরে যখন মার্কেটটা আবার চালু হলো সেই সময় ব্যবসায়ীরা আর রিটার্ন আসে নাই। অন্য মার্কেটে গিয়ে তারা সেটেল হয়ে গেলো। তারপরে তো ভাই প্যান্ডেমিক চলে আসলো, কোভিড। এই কোভিডের সময় কিছু ব্যবসায়ী একেবারে দোকান বন্ধ করে গেলো। এভাবে আস্তে আস্তে দোকানগুলো বন্ধ হতে শুরু করলো। আমরা যেদিন মার্কেট ক্লোজ করি সেদিন সর্বসাকুল্যে ভেতরে ১৭টা দোকান খোলা ছিল। বাইরেরগুলো মিলে টোটাল ২৫টা দোকান খোলা ছিল।’

আর্থিক চিত্র তুলে ধরে আনন্দ শাহ বলেন, ‘মার্কেটের মাসিক কারেন্ট বিলসহ স্টাফ স্যালারিসহ খরচ প্রায় ১৫ লাখ টাকা প্লাস। কিন্তু সেখানে সার্ভিস চার্জ পাচ্ছিলাম সর্বোচ্চ ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।’

বর্তমানে মার্কেটের বিদ্যুৎবিল বকেয়া ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তিনি আগেও বলেছেন, ‘সার্ভিস চার্জ আসছিল না, কারেন্ট বিল ডিউ হয়ে গেছে প্রায় ৫০ লাখ। যার কারণে সব মালিকরা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্কেট বন্ধ রেখেছে।’

বিগত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মার্কেট কমিটির কর্মকর্তা ও কিছু সম্মানিত মালিকের কাছ থেকে লোন নিয়ে মার্কেট চালানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, মার্কেটটি আর রি-ওপেন করার পরিকল্পনা নেই। সব মালিকের যৌথ সিদ্ধান্তে (ইজিএম) মার্কেটটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের ইজিএম-এ যৌথ সিদ্ধান্ত, মার্কেটটা বিক্রি করবো। মার্কেটটা বিক্রি করার পরে যারা কিনবে, একক কোম্পানি হতে পারে যৌথ কোম্পানি হতে পারে, তারা যা করবে এটা তাদের বিষয়।’

এই মুহূর্তে একাধিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মালিক সমিতি। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, করপোরেট অফিস বা ব্যাংক করার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে।

মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এ কে এম ইকবালও জানিয়েছেন, ‘এটা আমরা বিক্রি করে দিচ্ছি। সব মালিকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’

বন্ধের ঘোষণা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘শোনেন, আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কারণ আমার বাচ্চারা তো এখানে এসে শপিং করতো, এখানে এসে বলতো যে এখানে আমার বাবার দোকান আছে, আমার বাবা মার্কেটের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আমি নিজে ফিল করতাম। কিন্তু সেটা থেকে তো আমিও বঞ্চিত হচ্ছি ভাই। আমাদের প্রত্যেকটা মালিকের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কিন্তু আসলে এটা ছাড়া তো আমাদের বিকল্প আর পথ নাই। আমরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি ডে বাই ডে, এখান থেকে তো উঠে আসার সুযোগ নাই।’

তবে মূল ভবনের আবাসিক অংশ এই বন্ধের সিদ্ধান্তের আওতামুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ