বয়স নয়, অভিজ্ঞতাই প্রবীণদের সবচেয়ে বড় পরিচয়

যে হাত ধরে আমরা পৃথিবীর আলো দেখেছি, সেই হাত যেন বার্ধক্যে এসে অবহেলার শিকার না হয়

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষ জীবনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে একদিন বার্ধক্যে উপনীত হয়। শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষ প্রবীণ হয়ে ওঠে। বয়সের এই পর্যায়টি কারও জন্য শান্তি ও প্রশান্তির, আবার কারও জন্য নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাসের। অথচ প্রবীণরা আমাদের সমাজের বোঝা নন; তাঁরা আমাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার, আমাদের শেকড়, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের পারিবারিক স্মৃতির জীবন্ত ধারক।
একজন প্রবীণ মানুষের কাঁপা হাতের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের বহু বছরের গল্প। তাঁর চোখে থাকে দেখা-না-দেখা অসংখ্য সময়ের স্মৃতি। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে থাকে জীবনের নানা উত্থান-পতন, সংকট মোকাবিলার শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দিকনির্দেশনা। তাই বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হয়ে গেলেই একজন মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যান না। বরং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক ক্ষেত্রে আরও প্রজ্ঞাবান করে তোলে।
প্রতি বছর ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালিত হয়। প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টি সামনে আনাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
তবে প্রশ্ন হলো শুধু একটি দিনে প্রবীণদের কথা বললেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
দিবস আসে, দিবস যায়। সভা হয়, আলোচনা হয়, সেমিনার হয়, নানা প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়। কিন্তু যে বৃদ্ধ বাবা সারাদিন দরজার দিকে তাকিয়ে সন্তানের ফেরার অপেক্ষা করেন, যে মা সন্তান-নাতি-নাতনির কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে রাত পার করেন, তাঁদের নিঃসঙ্গতার খবর আমরা কতটা রাখি?
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক জীবনের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা ছিলেন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। সময়ের পরিবর্তনে পরিবার ছোট হয়েছে, কর্মজীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, শহরমুখী জীবনযাত্রা বেড়েছে। এর সঙ্গে বদলেছে পারিবারিক সম্পর্কের ধরনও।
অনেক প্রবীণ এখন একই পরিবারের সদস্য হয়েও একাকী জীবন কাটান। একই ছাদের নিচে থেকেও সন্তানের সঙ্গে তাঁদের কথা হয় না, নাতি-নাতনির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয় না। কেউ কেউ শারীরিক অসুস্থতার কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর এই নির্ভরশীলতাই কখনো কখনো তাঁদের পরিবারের কাছে ‘বোঝা’ হিসেবে প্রতীয়মান করে।
এটি শুধু একজন প্রবীণের ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; এটি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধেরও পরীক্ষা।
যে বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়েছেন, যে মা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের প্রাপ্য হওয়া উচিত ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সম্মান। করুণা নয় প্রবীণদের প্রয়োজন মর্যাদা।
প্রবীণদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো একাকিত্ব। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা চলাফেরার সীমাবদ্ধতার চেয়েও অনেক সময় একাকিত্ব বেশি কষ্ট দেয়।
একজন প্রবীণ হয়তো সারাদিন কারও সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় থাকেন। তিনি হয়তো একই গল্প বারবার বলেন। কারণ গল্পটি তাঁর কাছে শুধু গল্প নয় এটি তাঁর জীবনের স্মৃতি। আমরা যদি বিরক্ত হয়ে তাঁকে থামিয়ে দিই, তাহলে হয়তো তাঁর কথাই নয়, তাঁর জীবনের একটি অংশকেও আমরা অস্বীকার করি।
প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের পাশে বসা, তাঁদের পুরোনো দিনের গল্প শোনা, চিকিৎসার খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় কাজে সহযোগিতা করা এসব খুব বড় কোনো কাজ নয়। কিন্তু একজন প্রবীণের কাছে এগুলো হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ, দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর মুহূর্তে জানতে পারে। কিন্তু তথ্য আর অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়।
একজন প্রবীণ মানুষ হয়তো আধুনিক প্রযুক্তির অনেক কিছু জানেন না। কিন্তু তিনি জানেন দীর্ঘদিনের জীবনসংগ্রামের বাস্তবতা। তিনি জানেন প্রতিকূল সময়ে কীভাবে পরিবারকে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে সংকটে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কীভাবে অল্প নিয়ে সংসার চালাতে হয়, কীভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়।
তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য এক ধরনের জীবন্ত পাঠশালা। তাই প্রবীণদের সামাজিক ও পারিবারিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। পরিবারে তাঁদের মতামতের মূল্য দেওয়া উচিত। এতে শুধু প্রবীণদের সম্মানই বাড়ে না, তরুণ প্রজন্মও বাস্তব জীবন সম্পর্কে মূল্যবান শিক্ষা পায়।
বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ও প্রবীণদের সেখানে বসবাসের বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। সব বৃদ্ধাশ্রমকে একভাবে দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পরিচর্যার জন্য প্রবীণদের আবাসিক সেবা দরকার হতে পারে। কিন্তু কোনো বাবা-মা যেন সন্তানের অবহেলা, অনাদর কিংবা পারিবারিক বিরোধের কারণে আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বৃদ্ধাশ্রমকে শেষ ঠিকানা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য না হন এটাই আমাদের কাম্য।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি আমাদের আরও বড় প্রশ্ন করতে হবে কেন একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে এসে নিজের পরিবারের মধ্যেই একাকী হয়ে পড়ছেন?
বাংলাদেশে বয়স্কভাতা কর্মসূচি অনেক দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছে। অল্প অর্থ হলেও এটি অনেক প্রবীণের কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর একটি স্বতন্ত্র অবলম্বন। কেউ ওষুধ কেনেন, কেউ নিজের ছোটখাটো প্রয়োজন মেটান, কেউ আবার পরিবারের কাছে হাত না পেতে এই অর্থ ব্যবহার করেন।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় এই ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা অনেকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ভাতা প্রদানে স্বচ্ছতা, প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন এবং সহজে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শহরের প্রবীণদের পাশাপাশি গ্রামবাংলার বয়স্ক মানুষদের জীবনও আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে হবে। কৃষিনির্ভর জীবনে অবসর বলে নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। শরীর যতক্ষণ সায় দেয়, অনেক কৃষক ততক্ষণ কাজ করে যান। বয়স বাড়লেও সংসারের প্রয়োজনে মাঠে যেতে হয়, গবাদিপশু দেখাশোনা করতে হয়, পরিবারের কাজে যুক্ত থাকতে হয়।
অনেক গ্রামীণ প্রবীণ দারিদ্র্য, চিকিৎসার অপ্রতুলতা ও পারিবারিক অনটনের কারণে জীবনের শেষ সময়েও কঠোর পরিশ্রম করেন। তাঁদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তার সুযোগ আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই আজ যে তরুণ প্রবীণদের অবহেলা করছে, কাল সে নিজেও প্রবীণ হবে।
সময় কাউকে ছাড় দেয় না। আজ যে হাত শক্তিশালী, একদিন সেই হাত কাঁপবে। আজ যে চোখ দ্রুত দেখে, একদিন সেই চোখে ঝাপসা নামবে। আজ যে পা দ্রুত চলে, একদিন সেই পা ধীর হয়ে যাবে। আজ যে মানুষ অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করেন না, একদিন তিনিও কারও হাত ধরে হাঁটতে চাইবেন।
তাই প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণ আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা আজ তাঁদের যে সম্মান দেব, আগামী প্রজন্মও একদিন আমাদের কাছ থেকে সেই সম্মানই প্রত্যাশা করবে।
প্রবীণ দিবস তাই কেবল প্রবীণদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি আমাদের নিজেদের মানবিকতা যাচাইয়ের একটি দিন। আমরা কেমন সন্তান, কেমন পরিবার, কেমন সমাজ এবং কেমন মানুষ—এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার দিন।
প্রবীণদের প্রয়োজন করুণা নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা। তাঁদের প্রয়োজন দয়া নয়, প্রয়োজন সম্মান। তাঁদের প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজন কথা বলার একজন মানুষ। তাঁদের প্রয়োজন শুধু খাবার নয়, প্রয়োজন আপনজনের সান্নিধ্য। তাঁদের প্রয়োজন শুধু নিরাপদ আশ্রয় নয়, প্রয়োজন নিজের পরিবারে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।
আসুন, ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রবীণ দিবসে আমরা শুধু অনুষ্ঠান না করি; নিজেদের পরিবার থেকেই পরিবর্তনের শুরু করি। বাড়ির প্রবীণ মানুষটির পাশে একটু বসি। তাঁর কথা শুনি। চিকিৎসার খোঁজ নিই। তাঁর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিই। তাঁর মতামতকে মূল্য দিই। সন্তান হিসেবে, স্বজন হিসেবে এবং মানুষ হিসেবে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিই।
কারণ যাঁরা আমাদের শৈশবে হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁদের হাত ধরার দায়িত্ব আমাদেরই।
প্রবীণরা আমাদের অতীত নন; তাঁরা আমাদের বর্তমানের শেকড় এবং ভবিষ্যতের আয়না। তাঁদের ভালো রাখার মধ্যেই আমাদের মানবিক সমাজের পরিচয়। বিশ্ব প্রবীণ দিবস ২০২৬ হোক প্রবীণদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধ নতুন করে জাগ্রত করার অঙ্গীকারের দিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ