তথ্য মানুষের ক্ষমতা। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে একজন নাগরিক যেমন নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন, তেমনি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্নও তুলতে পারেন। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট, ব্যয়, সেবা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নাগরিকের জানার সুযোগ থাকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক তথ্যের সার্বজনীন অধিকার দিবস।
ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলন ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক তথ্যের সার্বজনীন অধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদও দিনটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সালে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। বর্তমানে ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।
তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে শুধু কোনো সরকারি দপ্তর থেকে একটি কাগজ বা নথি পাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে এর ব্যাপকতা বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, জনসম্পৃক্ততা এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা। তথ্য না থাকলে নাগরিক অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকেন। আর তথ্য সহজলভ্য হলে নাগরিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে, প্রশ্ন করতে এবং প্রয়োজন হলে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
বাংলাদেশেও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের বিধান সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য লাভের অধিকার রয়েছে এবং নাগরিকের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। একই আইনে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়েও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই আইনের গুরুত্ব এখানেই যে, তথ্যকে রাষ্ট্রীয় দপ্তরের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিকের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান কী করছে, কীভাবে করছে এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এসব বিষয়ে আইনসম্মতভাবে তথ্য চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে আইন থাকা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ দুটি এক বিষয় নয়। তথ্য অধিকার কার্যকর করতে হলে নাগরিককে জানতে হবে কোন তথ্য চাওয়া যায়, কোথায় আবেদন করতে হয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এবং তথ্য না পাওয়া গেলে কীভাবে আপিল বা অভিযোগ করতে হয়। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তথ্য সংরক্ষণ, প্রকাশ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে।
বাংলাদেশের তথ্য কমিশনের প্রকাশিত নথিতেও তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ, আবেদন, আপিল ও অভিযোগ নিষ্পত্তির বিভিন্ন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে।
একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কথা ধরা যাক। প্রকল্পের ব্যয় কত, কত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা, বাস্তবে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কাজের অগ্রগতি কতটুকু এসব তথ্য নাগরিকের কাছে উন্মুক্ত থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। একইভাবে কোনো সরকারি সেবা পেতে কত সময় লাগার কথা, কী পরিমাণ ফি নির্ধারিত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব কী এসব তথ্য জানা থাকলে একজন নাগরিক হয়রানি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পান।
কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, ভূমি, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা অবকাঠামো প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্যের গুরুত্ব রয়েছে। কোনো এলাকায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে কি না, কোনো বিদ্যালয়ের জন্য কী পরিমাণ সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, কোনো এলাকায় নদী বা জলাশয় রক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এসব তথ্য জনগণের জানার বিষয়।
তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থাকলে শুধু সাংবাদিক বা গবেষকরাই উপকৃত হন না; সাধারণ নাগরিকও উপকৃত হন। একজন কৃষক কৃষি-সহায়তার নিয়ম জানতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাবৃত্তির তথ্য জানতে পারেন, একজন শ্রমিক শ্রম অধিকারসংক্রান্ত সরকারি বিধান জানতে পারেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি সেবার নির্ধারিত নিয়ম সম্পর্কে জানতে পারেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি নতুন কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সেবা ও ডিজিটাল নথির মাধ্যমে আগের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হয় না।
তথ্য হতে হবে নির্ভুল, সময়োপযোগী, বোধগম্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিভাজনও একটি বড় বিষয়। ইন্টারনেট বা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ যাদের কম, তারা যদি প্রয়োজনীয় সরকারি তথ্য থেকে পিছিয়ে পড়েন, তাহলে তথ্যের সার্বজনীন অধিকার বাস্তবে অসম হয়ে যেতে পারে।
এর পাশাপাশি ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্যের অধিকার মানে যেকোনো তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা নয়। বরং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করার সক্ষমতাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
তথ্য অধিকার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেকাংশেই নথি, পরিসংখ্যান, সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। তথ্যপ্রাপ্তির আইনগত সুযোগ সাংবাদিকদের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অনুসন্ধানে সহায়তা করতে পারে।
তবে তথ্য চাওয়া এবং তথ্য প্রকাশ দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কিংবা আইন দ্বারা সংরক্ষিত তথ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান মানতে হয়। একই সঙ্গে কোনো তথ্য হাতে পাওয়ার পর তার সত্যতা যাচাই না করে প্রকাশ করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আন্তর্জাতিক তথ্যের সার্বজনীন অধিকার দিবসের মূল তাৎপর্য তাই শুধু একটি দিবস পালন বা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সম্পর্কে নাগরিককে সচেতন করা এবং আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য যতটা সম্ভব স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করা। নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হলে প্রশাসনিক চাপ বাড়ে এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে সময়ও লাগে। বিপরীতে বাজেট, প্রকল্প, সেবা, সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম ও ব্যয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা গেলে নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হয়।
একই সঙ্গে তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও নাগরিকবান্ধব করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ডিজিটাল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী যাতে সমানভাবে তথ্য পেতে পারেন, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিক যত বেশি তথ্যসমৃদ্ধ হন, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগও তত বাড়ে। তথ্য মানুষকে শুধু জানায় না; প্রশ্ন করার, সিদ্ধান্ত বোঝার এবং নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাও বাড়ায়। এ কারণেই ইউনেস্কো তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে মানবাধিকার, উন্নয়ন, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
২৮ সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। আইন থাকলেই তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, সচেতন নাগরিক এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ।
তথ্য গোপন করার সংস্কৃতির পরিবর্তে তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি যত বিস্তৃত হবে, ততই শক্তিশালী হবে জবাবদিহি। আর জবাবদিহি শক্তিশালী হলে সুশাসনের ভিত্তিও মজবুত হবে। তাই আন্তর্জাতিক তথ্যের সার্বজনীন অধিকার দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিত তথ্য মানুষের অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
shafiqualalam@gmail.com