যুদ্ধ, বাণিজ্য ও ডলারের আধিপত্য কমানোর উদ্যোগে নজর বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্যের নতুন পরীক্ষা

ব্রিকস সম্মেলনে নতুন সমীকরণ, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও ঝুঁকি

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুই দিনের এই সম্মেলনে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর নেতারা এমন এক সময়ে একত্র হয়েছেন, যখন পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সম্মেলনের আলোচনায় থাকছে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। 

তবে এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বরং সদস্যদেশগুলোর ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেও তারা কতটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় যৌথ ঘোষণা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণায় একমত হয়েছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে একতরফা যুদ্ধের নিন্দা জানানোর কথা রয়েছে।

ব্রিকসের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় সদস্যদেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্টও ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

এর সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ আসতে পারে। ভারতের সভাপতিত্বে বিভিন্ন খাতে ৫০টির বেশি বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

১৩ সেপ্টেম্বর সম্মেলনের শেষ দিনে নয়াদিল্লি ঘোষণা গ্রহণের কথা রয়েছে। সেখানে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর বিষয়ে সদস্যদের অবস্থান তুলে ধরা হতে পারে।

এবারের সম্মেলন থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ভারতের। কারণ, দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখে নিজেকে বৈশ্বিক শক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

সম্মেলনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে; আবার পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারা নয়াদিল্লির জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নয়াদিল্লি সফরও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর পর তাঁর ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের মঞ্চে ভারত নিজেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছে।

চীনের জন্য ব্রিকস হচ্ছে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আর্থিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানো গেলে চীনের জন্য নতুন বাজার ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে ব্রিকসের ভেতরে চীনের প্রভাব যত বাড়বে, অন্য সদস্যদের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত চায় না যে ব্রিকস চীনের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক জোটে পরিণত হোক। ফলে সম্মেলনে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নেতৃত্ব ও প্রভাবের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

রাশিয়ার জন্য ব্রিকস পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার তৈরির সুযোগ। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো গেলে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ পাবে মস্কো।

ইরানের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তেহরান ব্রিকসকে রাজনৈতিক সমর্থন, বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। তবে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করতে পারে প্রচলিত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর। তবে এখানেই বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক স্বার্থ ও বৈদেশিক নীতিতে বড় পার্থক্য থাকায় ডলারের বিকল্প একটি পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়।

বরং ব্রিকসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হতে পারে অভ্যন্তরীণ বিভাজন। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক বিরোধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সদস্যদের ভিন্ন অবস্থান একক সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কঠিন করে তুলছে।

বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস সম্মেলনের গুরুত্ব মূলত তিন জায়গায় বাণিজ্য, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব।

চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, মিশর ও ব্রাজিলসহ ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন বাজার তৈরি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে বিকল্প মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এর বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ যদি কোনো একটি শক্তির বলয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তাহলে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো ব্রিকসকে কোনো পক্ষের বিপরীতে অবস্থান নেওয়ার মঞ্চ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে। জুলাইয়ে ভারতীয় পক্ষের আমন্ত্রণের খবর প্রকাশিত হলেও সর্বশেষ বাংলাদেশি সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরাসরি নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, সম্মেলনে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি থাকবেন।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক বার্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশ সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করাই ঢাকার জন্য বাস্তবসম্মত পথ।

শেষ পর্যন্ত এবারের ব্রিকস সম্মেলনের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নের ওপর। যুদ্ধ ও বিভক্তির মধ্যেও যদি সদস্যদেশগুলো বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় বাস্তব অগ্রগতি করতে পারে, তাহলে ব্রিকসের বৈশ্বিক প্রভাব আরও বাড়বে। আর অভ্যন্তরীণ বিরোধ যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে এটি বড় অর্থনৈতিক শক্তির সমষ্টি হয়েও কার্যকর রাজনৈতিক জোটে পরিণত হওয়ার সীমাবদ্ধতা কাটাতে পারবে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ