বুরকিনা ফাসোর সামরিক নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে আফ্রিকার তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন মূলত ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, পশ্চিমা প্রভাব প্রত্যাখ্যান এবং দেশের নিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরতার প্রতিশ্রুতির কারণে। কিন্তু জঙ্গি সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা, বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করার সমালোচনা এখন তাঁর নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের দেশ বুরকিনা ফাসো কয়েক বছর ধরে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতায় বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। ক্ষমতায় এসেই তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেন এবং সাধারণ মানুষকে প্রতিরোধে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন।
ত্রাওরের জাতীয়তাবাদী অবস্থান, ফ্রান্সের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান এবং রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা তাঁকে শুধু বুরকিনা ফাসোতেই নয়, আফ্রিকার একটি বড় অংশের তরুণদের কাছেও জনপ্রিয় করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে প্রায়ই আফ্রিকার সার্বভৌমত্ব ও ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তবে জনপ্রিয়তার এই আবরণ এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ত্রাওরের ক্ষমতায় আসার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আগের সরকারের আমলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেশের ভূখণ্ড থেকে জিহাদি গোষ্ঠীগুলোকে হটিয়ে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবেন। সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি তিনি ‘ভলান্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ বা ভিডিপি বাহিনী বড় করেন। সাধারণ নাগরিকদেরও সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত করা হয়।
কিন্তু ২০২৬ সালেও জিহাদি হামলা বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে সেনা, ভিডিপি ও বেসামরিক মানুষ হামলার শিকার হচ্ছেন। ফলে ত্রাওরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তিনি যে নিরাপত্তা সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেটি কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন?
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বুরকিনা ফাসোকে সাহেল অঞ্চলের চরমপন্থী সহিংসতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ত্রাওরে সরকারের সামরিক অভিযান যত কঠোর হয়েছে, ততই বেসামরিক মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হামলার জবাবে সরকারি বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর অভিযানে বেসামরিক মানুষও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দাবি উঠেছে।
এটি ত্রাওরের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ জঙ্গিবাদ দমন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যদি নিরাপত্তাহীনতা বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হন, তাহলে সরকারের জনপ্রিয়তার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ত্রাওরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনাগুলোর একটি হচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধীদের জন্য জায়গা সংকুচিত করা।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তাঁর সরকার দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের যুক্তি, বহুদলীয় রাজনীতি দেশের বিভাজন বাড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছে।
এ ছাড়া সমালোচক, স্বাধীন গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ওপর চাপ বাড়ার অভিযোগ রয়েছে। বুরকিনা ফাসোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বার্টেলসম্যান ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্সের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন এবং মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
ত্রাওরের জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি হচ্ছে তরুণ সমাজ। তিনি নিজেকে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থাকা একজন তরুণ সামরিক নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফ্রান্সের পরিবর্তে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা, দেশের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার প্রচেষ্টা তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
কৃষিতে স্বনির্ভরতার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এমনকি সাহেলের তুলনামূলক শুষ্ক এলাকায় আনারস উৎপাদন সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগও সরকারের খাদ্য ও কৃষি স্বনির্ভরতার বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য দিয়ে নিরাপত্তা সংকট ঢেকে রাখা কঠিন। ত্রাওরের জন্য সাম্প্রতিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা এসেছে প্রতিবেশী নাইজার থেকে। গত ২৯ আগস্ট নাইজারের রাজধানী নিয়ামেতে বিদ্রোহী সেনারা বিমানবন্দর ও প্রেসিডেন্টের স্থাপনায় হামলা চালায়। পরে রুশ বাহিনীর সহায়তায় নাইজারের সামরিক সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের জিহাদি যুদ্ধ শুধু সাধারণ মানুষের ওপর নয়, সামরিক বাহিনীর ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি করে। বারবার প্রাণহানি ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থতা সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ বাড়াতে পারে। বুরকিনা ফাসোতেও ত্রাওরের জন্য সামরিক বাহিনীর ঐক্য তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রাওরের সামনে এখন মূলত তিনটি বড় পরীক্ষা নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক বৈধতা।
প্রথমত, জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হামলা কমিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে জনগণের জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা সামলাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ত্রাওরে যে কারণে জনপ্রিয় হয়েছেন, সেই কারণই এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জঙ্গিবাদ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তাই নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাঁর জনপ্রিয়তার রাজনৈতিক মূল্য কমতে পারে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক দল বিলুপ্তি, বিরোধীদের ওপর চাপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে ‘জনগণের নেতা’ হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তির সঙ্গে সামরিক শাসকের পরিচয়ের দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হবে।
ফলে ত্রাওরের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু তিনি কতটা জনপ্রিয়—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কঠোর নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি কি সত্যিই বুরকিনা ফাসোকে জঙ্গিবাদ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্র থেকে বের করে আনতে পারবেন? আগামী দিনের বুরকিনা ফাসোর রাজনীতিতে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ত্রাওরের জনপ্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি সময়ের সঙ্গে তা চাপের মুখে পড়বে।