সহিংসতা, প্রাণহানি, দমন-পীড়নের পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনকে শুধু ‘ছাত্র আন্দোলনের ফল’ হিসেবে দেখলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি সহিংসতা, প্রাণহানি ও সরকারি দমন-পীড়নের পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবি পেছনে পড়ে সামনে আসে সরকারের পদত্যাগের দাবি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (OHCHR)-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে জুনের মাঝামাঝি শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের পর তা ব্যাপক বিক্ষোভ ও অস্থিরতায় রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট সরকার পদত্যাগ করে। অর্থাৎ পতনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক শক্তি ছিল বিস্তৃত গণআন্দোলন যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই ছিল শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনের প্রথম ধাপ নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে জুলাইয়ের শুরুতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। তাদের দাবি ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (EUAA)-এর ঘটনাপঞ্জি অনুযায়ী, ১–৩ জুলাই আন্দোলন শুরু হয়, ৭–১০ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি দেওয়া হয় এবং ১৫–১৭ জুলাই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৮–১৯ জুলাই বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার পর পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। পরদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ১৮ জুলাই দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯ জুলাই সরকার কারফিউ জারি করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ পর্যন্ত আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষার্থীরা কিন্তু এখান থেকেই আন্দোলনটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ দুর্নীতি, বিতর্কিত নির্বাচন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অর্থাৎ কোটা সংস্কারের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়। এখানেই আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদে যুক্ত হন।

EUAA-এর ঘটনাপঞ্জিতে দেখা যায়, ৩০ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নীরব মিছিল করেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সমাবেশ করেন। সন্তানদের মৃত্যুর প্রতিবাদে অভিভাবকরাও মাঠে নামেন। একই সময়ে বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি অংশ সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে।

আন্দোলনটির নেতৃত্ব ছাত্রদের হাতে থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোও পরিস্থিতিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে বিএনপি জাতীয় ঐক্য এবং সরকারের পদত্যাগের আহ্বান জানায়। একই সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং বিরোধী দলের ওপর অভিযান চলতে থাকে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা ছিল, কিন্তু আন্দোলনের মূল সাংগঠনিক নেতৃত্ব তাদের হাতে ছিল না।

আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ হাতে। রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তী পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়। আন্দোলনকে সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হয়ে ওঠে প্রাণহানি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর আগস্ট ২০২৪-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানায়, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল এবং নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২ জন শিশু ছিল। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে শক্তিশালী ইঙ্গিত পাওয়ার কথা বলা হয়। ফলে কোটা সংস্কারের প্রশ্নটি আর একমাত্র ইস্যু থাকেনি।

৩ আগস্ট ২০২৪-এ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের দাবি এক দফায় নামিয়ে আনে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের পদত্যাগ। একই সঙ্গে ৪ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলন আর কোটা সংস্কার আন্দোলন থাকেনি। এটি পরিণত হয় সরকার পতনের আন্দোলনে। এর পরের ৪৮ ঘণ্টাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় সময়গুলোর একটি।

৪ আগস্ট থেকে আন্দোলনের বিস্তার আরও বাড়ে। রাস্তায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও যুক্ত হতে থাকেন। শহরের বিভিন্ন সড়কে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়ে। পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। এ সময় সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ৪ আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১০০ মানুষের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। অর্থাৎ ৫ আগস্টের আগে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সরকারের বিরুদ্ধে শুধু একটি ছাত্রগোষ্ঠী নয়, বৃহত্তর জনঅসন্তোষ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

EUAA-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে অনীহা তৈরি হয়। ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় শেখ হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ছাড়েন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেনাপ্রধান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এখানে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসে গণআন্দোলন সরকারের ওপর যে চাপ তৈরি করেছিল, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর অবস্থান পরিবর্তন সেই চাপকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সেনাবাহিনী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। বরং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে তাদের অবস্থান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

৫ আগস্টের সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ঢল নামে। আন্দোলনকারীদের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি কার্যত সরকার পতনের চূড়ান্ত চাপ তৈরি করে। দুপুরের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। OHCHR বলছে, ব্যাপকভিত্তিক বিক্ষোভ ও অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট সরকার পদত্যাগ করে এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। অতএব, ৫ আগস্টের ঘটনাকে শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখলে আন্দোলনের বিস্তৃতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কোনো বড় গণআন্দোলনের ফলকে একজন বা একটি গোষ্ঠীর একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখলে ঘটনাটির বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি আড়াল হয়ে যায়।

২০২৪ সালের আন্দোলনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল প্রধান ও সূচনাকারী। কিন্তু সেই আন্দোলন সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল বৃহত্তর জনসমর্থন, ধারাবাহিক প্রাণহানির পর তৈরি জনক্ষোভ, পেশাজীবী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণ, বিরোধী রাজনৈতিক চাপ, অসহযোগ আন্দোলন এবং শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় শক্তির অবস্থানের পরিবর্তন। তাই শেখ হাসিনার পতনের ইতিহাসকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায় এটি ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন, যা ক্রমে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করে যে সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি।

শেখ হাসিনার পতনের একক কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়তো আরও বহুদিন চলবে। কেউ বলবেন ছাত্ররাই পতন ঘটিয়েছে, কেউ বলবেন সাধারণ মানুষ, কেউ রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সামনে আনবেন, আবার কেউ সেনাবাহিনীর শেষ মুহূর্তের অবস্থানকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখবেন।

কিন্তু ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে জুনে শুরু হওয়া কোটা আন্দোলন জুলাইয়ে রক্তাক্ত সংঘাতে পরিণত হয়; সেখান থেকে তৈরি হয় জনক্ষোভ; আন্দোলনে যুক্ত হয় শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ; বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সরকারবিরোধী অবস্থান নেয়; আগস্টে ছাত্র নেতৃত্ব এক দফা পদত্যাগের দাবি ঘোষণা করে; অসহযোগ আন্দোলন দেশব্যাপী চাপ বাড়ায়; আর শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় শক্তির অবস্থান সরকারের জন্য সংকটকে চূড়ান্ত করে। এই ধারাবাহিকতাই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ছবি।

সুতরাং, “হাসিনার পতন শুধু ছাত্রদের আন্দোলনের ফল” এটি আংশিক সত্য। আরও পূর্ণাঙ্গ সত্য হলো, ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। আর সেই গণআন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতই ৫ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রকে পাল্টে দেয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ