ইতিহাস কি শুধু বিজেতার কাহিনি, নাকি পরাজিতের স্মৃতিও তার অংশ?

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন: আট শতকের ক্ষমতা, সংঘাত ও সহাবস্থানের ইতিহাস

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো নিয়ে কথা বললেই ইতিহাস আর নিছক ইতিহাস থাকে না তা হয়ে ওঠে বর্তমান রাজনীতির অস্ত্র। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

এক পক্ষের কাছে এটি গৌরবের ইতিহাস সুলতান, বাদশাহ, বিশাল সাম্রাজ্য, তাজমহল, লালকেল্লা, দিল্লির দরবার, পারসিক সাহিত্য, উর্দুর বিকাশ এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামী ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব। অন্য পক্ষের কাছে এটি বিদেশি আক্রমণ, মন্দির ধ্বংস, ধর্মীয় বৈষম্য, জিজিয়া এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি কোনো পক্ষের রাজনৈতিক স্লোগান মেনে চলে না।

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা থেকে বের হতে হবে। ‘মুসলিম শাসন’ মানেই একজন মুসলমান শাসক এবং তাঁর বিপরীতে একটি অভিন্ন ‘হিন্দু সমাজ’ মধ্যযুগীয় ভারত কখনো এত সরল ছিল না। তখনকার রাজনীতি ছিল ক্ষমতা, ভূমি, রাজস্ব, সামরিক আনুগত্য, বংশীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক শক্তি ও ধর্মীয় পরিচয়ের জটিল সমন্বয়। মুসলিম শাসকের সেনাবাহিনীতে হিন্দু সৈনিক ছিল, প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তা ছিল, হিন্দু রাজাদের সঙ্গে মুসলিম সুলতানদের জোট হয়েছে; আবার মুসলিম শাসকদের মধ্যেও একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে।

ভারতবর্ষে ইসলামের উপস্থিতি দিল্লির সিংহাসন দখলের বহু আগে। আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের যোগাযোগ ভারত মহাসাগরীয় উপকূলে পৌঁছেছিল। পশ্চিম উপকূলে মুসলিম বণিকদের বসতি গড়ে ওঠে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ইসলামী শাসনের প্রথম বড় উপস্থিতি আসে সিন্ধু অঞ্চলে।

৮ম শতকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযান ছিল সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটি প্রাথমিক অধ্যায়। কিন্তু এটিকে গোটা ভারতবর্ষের ওপর মুসলিম শাসনের সূচনা হিসেবে দেখলে ইতিহাসের পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ পড়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে একের পর এক সামরিক অভিযান উত্তর-পশ্চিম ভারতকে অস্থির করে তোলে।

মাহমুদ গজনভির নাম এখানে বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর ভারত অভিযান নিয়ে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। তিনি মন্দিরে আক্রমণ করেছেন, সম্পদ লুট করেছেন এগুলো ইতিহাসের অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, তাঁর সামরিক অভিযান ছিল মূলত সাম্রাজ্য বিস্তার ও সম্পদ আহরণের মধ্যযুগীয় রাজনীতির অংশ।

১১৯২ সালের দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয় উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আনে। ঘোরীর মৃত্যুর পর তাঁর সামরিক দাস ও সেনাপতিদের একজন কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিকেন্দ্রিক নতুন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি তৈরি করেন। ১২০৬ সাল থেকে শুরু হয় দিল্লি সালতানাতের দীর্ঘ অধ্যায়। এখানেই ভারতবর্ষে মুসলিম রাজনৈতিক শাসন একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো পেতে শুরু করে। দিল্লি সালতানাত কোনো একক রাজবংশ ছিল না। মামলুক, খিলজি, তুঘলক, সৈয়দ ও লোদি পরপর পাঁচটি রাজবংশ দিল্লির ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দীর এই সময়ে দিল্লি শুধু রাজনৈতিক রাজধানী ছিল না; এটি হয়ে ওঠে একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। মধ্য এশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান ও ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে এসে বসতি স্থাপন করে।

মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসকদের নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের বড় একটি সমস্যা হলো তাঁদের প্রায় সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা।

কিন্তু সুলতানি আমলের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ক্ষমতার লড়াই ছিল অনেক বেশি জটিল। সুলতানকে একদিকে বিদ্রোহী প্রাদেশিক শাসকদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে, অন্যদিকে অভিজাতদের আনুগত্য ধরে রাখতে হয়েছে। সীমান্তে মঙ্গোল আক্রমণ ঠেকাতে হয়েছে। রাজস্ব আদায় করতে হয়েছে। বিশাল সেনাবাহিনীকে অর্থ দিতে হয়েছে। আলাউদ্দিন খিলজির শাসন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার এবং সেনাবাহিনীর ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করেন। তাঁর শাসনকে কেবল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এসব প্রশাসনিক উদ্যোগের অর্থ বোঝা যাবে না। আবার তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে বহু রাজ্য আক্রান্ত হয়েছে, বহু মানুষ নিহত হয়েছে, সম্পদ লুট হয়েছে এই কঠিন বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

মুহাম্মদ বিন তুঘলককে নিয়ে ভারতীয় ইতিহাসে অসংখ্য গল্প আছে। কেউ তাঁকে পাগল শাসক বলেছেন, কেউ অসাধারণ মেধাবী কিন্তু বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রশাসক হিসেবে দেখেছেন। দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। দাক্ষিণাত্যকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছাকাছি আনার রাজনৈতিক যুক্তি হয়তো ছিল। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরের বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। প্রশাসনিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তখন রাষ্ট্রের শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ঘটনা শুধু মধ্যযুগের একটি ব্যর্থ নীতি নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি চিরন্তন শিক্ষাক্ষমতা থাকলেই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না।

বাংলায় স্বাধীন সুলতানাত গড়ে ওঠে। গুজরাটে শক্তিশালী সুলতানাত তৈরি হয়। জৌনপুর, মালওয়া, দাক্ষিণাত্যে বাহমনি এবং পরবর্তী দাক্ষিণাত্য সুলতানাতগুলো নিজেদের রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। দক্ষিণে একই সময়ে বিজয়নগর সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মধ্যযুগীয় ভারত ছিল বহু রাষ্ট্রের ভারত। কখনো মুসলিম সুলতান হিন্দু রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। কখনো হিন্দু রাজা মুসলিম সুলতানের সঙ্গে জোট করেছেন। কখনো একই ধর্মের দুই শাসক পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এই বাস্তবতা আজকের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ানকে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ মধ্যযুগীয় রাজনীতি আধুনিক ‘ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ’-এর ভাষায় পরিচালিত হয়নি।

১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে বাবর উত্তর ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করেন। এর মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। বাবর ছিলেন মধ্য এশিয়ার তিমুরীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পরবর্তী কয়েক প্রজন্মে এটি ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত হয় যে ‘বিদেশি’ পরিচয় দিয়ে একে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আকবরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য শুধু যুদ্ধজয় নয়। তাঁর আসল শক্তি ছিল বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সাম্রাজ্যের অংশ করে নেওয়ার ক্ষমতা। রাজপুতদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এর বড় উদাহরণ। আকবর বুঝেছিলেন, কয়েক লাখ সৈন্য দিয়ে বিশাল ভারতবর্ষ শাসন করা সম্ভব নয়। দরকার স্থানীয় অভিজাতদের সহযোগিতা। তাই তিনি রাজপুতদের প্রশাসন ও সামরিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। এখানে রাজনীতি ধর্মকে অতিক্রম করে যায়। একজন হিন্দু রাজপুত অভিজাত মুঘল সাম্রাজ্যের উচ্চপদে কাজ করছেন এই বাস্তবতা মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার জটিল চরিত্র বোঝায়।

আকবর ধর্মীয় নীতিতেও অন্য অনেক সমসাময়িক শাসকের তুলনায় উদার ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় মতের মানুষের সঙ্গে আলোচনায় বসতেন এবং সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্যকে ধর্মীয় একরূপতার ওপর নির্ভরশীল করেননি। এ কারণেই আকবরের রাজনীতি পরবর্তী ভারতীয় ইতিহাসে একটি আলাদা স্থান তৈরি করেছে।

আকবর ছিলেন সম্রাট। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ হয়েছে। বিদ্রোহ দমন হয়েছে। রক্তপাত হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর ‘সহনশীলতা’কে আধুনিক গণতন্ত্রের উদারতার সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় সম্রাট তাঁর উদারতা ছিল সাম্রাজ্য পরিচালনার একটি রাজনৈতিক কৌশলও। কিন্তু সেই কৌশল যে ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমন্বয় তৈরি করেছিল, সেটিও সত্য।

তাজমহল আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক। কিন্তু এর পেছনে ছিল একটি বিশাল সাম্রাজ্যিক অর্থনীতি, শ্রমব্যবস্থা এবং কারিগরি দক্ষতা। দিল্লির লালকেল্লা, জামে মসজিদ, আগ্রার দুর্গ।এসব স্থাপত্য শুধু ধর্মীয় ভবন নয়। এগুলো ছিল ক্ষমতার ভাষা। একটি সাম্রাজ্য তার শক্তি দেখাত সেনাবাহিনী দিয়ে, আবার স্মৃতি তৈরি করত স্থাপত্য দিয়ে। আজ মুঘল সাম্রাজ্য নেই। কিন্তু তার নির্মিত স্থাপত্য দাঁড়িয়ে আছে। সাম্রাজ্য শেষ হয়ে যায়, পাথর অনেক সময় থেকে যায়।

আওরঙ্গজেবকে ঘিরে ভারতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা যায়। তাঁকে এক পক্ষ মুসলিম শাসনের ধর্মীয় কঠোরতার প্রতীক হিসেবে দেখে। অন্য পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত অনেক অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত বলে মনে করে। সত্যটি সম্ভবত আরও জটিল। আওরঙ্গজেব জিজিয়া পুনরায় চালু করেন। তাঁর আমলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ধ্বংসের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনে বহু হিন্দু কর্মকর্তা ছিলেন এবং বিভিন্ন হিন্দু প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়ার নথিও পাওয়া যায়। এই আপাত-বিরোধী তথ্যগুলোকে একসঙ্গে দেখলেই শাসকের প্রকৃত চরিত্র বোঝা সম্ভব।

আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্রাট এটি সত্য। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে ছিলেন একটি বিশাল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক শাসক। মারাঠা শক্তির উত্থান, দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় তাঁর শাসনকে কঠিন করে তোলে। তাঁর সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে সর্বোচ্চ বিস্তৃতি লাভ করলেও রাজনৈতিকভাবে একই সময়ে তার ভিত দুর্বল হতে শুরু করে।এখানে ইতিহাসের একটি চমৎকার পরিহাস আছে সাম্রাজ্য যখন সবচেয়ে বড় হয়, তখনই তার ভেতরে পতনের বীজ জন্ম নিতে পারে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে শুধু আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের অতিসরলীকরণ। সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে ছিল একাধিক কারণ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাজস্বের চাপ, প্রাদেশিক শক্তির উত্থান, অভিজাতদের দ্বন্দ্ব, মারাঠাদের শক্তিবৃদ্ধি, প্রশাসনিক সংকট এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে। বাংলা, আওধ, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন অঞ্চল কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়। মারাঠা শক্তি উত্তর ভারতেও প্রভাব বিস্তার করে। এদিকে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতা কাজে লাগাতে শুরু করে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে আসে বাণিজ্যের জন্য। কিন্তু ধীরে ধীরে বাণিজ্য থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে সামরিক ক্ষমতা, সামরিক ক্ষমতা থেকে সাম্রাজ্য। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানির ক্ষমতা আরও দৃঢ় হয়। একসময় যারা মুঘল সম্রাটের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করত, তারাই শেষ পর্যন্ত মুঘল সম্রাটকে ক্ষমতাহীন প্রতীকে পরিণত করে।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর বাহাদুর শাহ জাফরকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এখানেও ইতিহাসের পরিহাস যে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশরা ‘অত্যাচারী’ শাসনের নানা বয়ান ব্যবহার করেছিল, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন নিজেই ভারতীয় সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

মুসলিম শাসনের সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার হয়তো কোনো একটি দুর্গ, মসজিদ বা রাজপ্রাসাদ নয়। বরং মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক মিশ্রণ।

সুফি সাধকরা বহু অঞ্চলে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। বিভিন্ন এলাকায় ইসলামের বিস্তারে রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি বাণিজ্য, সুফিবাদ, স্থানীয় সামাজিক কাঠামো এবং আন্তঃসম্প্রদায়িক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলার ইতিহাস এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় ইসলাম শুধু দিল্লির সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আসেনি। কৃষি সম্প্রসারণ, নতুন বসতি, নদীভিত্তিক ভূপ্রকৃতি, স্থানীয় সমাজ ও সুফি নেটওয়ার্ক সব মিলিয়ে দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলায় মুসলিম সমাজের বিস্তার ঘটে। এই কারণেই ভারতবর্ষে মুসলমানদের ইতিহাসকে শুধু ‘আক্রমণকারীদের ইতিহাস’ হিসেবে দেখলে ভারতীয় মুসলমান সমাজের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিকাশকে বোঝা যায় না।

রাজনৈতিক বিরোধে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার হয়েছে। মন্দির ধ্বংস হয়েছে। মসজিদও যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধর্মীয় কর আরোপ হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসনিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক জোট, আন্তঃসম্প্রদায়িক বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও হয়েছে। অতএব ইতিহাসের সত্য হলো সংঘাত এবং সহাবস্থান একই সময়ে ঘটেছে। এই দুই সত্যকে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না। কারণ ইতিহাস বর্তমান রাজনীতির জন্য শক্তিশালী অস্ত্র। বর্তমানের রাজনৈতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করতে অতীতের গৌরব বা ক্ষতকে ব্যবহার করা হয়। একদল বলে ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা শাসন করেছে।’ অন্য দল বলে ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা পরাজিত হয়েছে।’

কিন্তু এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে যে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ ছিল কৃষক, কারিগর, ব্যবসায়ী, সৈনিক, নারী, শ্রমিক, কবি, সুফি, পুরোহিত, পণ্ডিত তাদের জীবন কোথায়? সাম্রাজ্যের ইতিহাসে রাজা থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে। তাজমহল দেখা যায়, কিন্তু যে শ্রমিক পাথর কেটেছিল তার নাম হারিয়ে যায়। দিল্লির দুর্গ দেখা যায়, কিন্তু যে কৃষকের রাজস্বে সেই সাম্রাজ্যের অর্থনীতি চলত, তার গল্প কম শোনা যায়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাজ তাই শুধু রাজাদের স্মরণ করা নয়, রাজাদের শাসিত মানুষদেরও খুঁজে বের করা।

আজ আমরা মধ্যযুগের শাসকদের বিচার করছি ২১ শতকের নৈতিকতা দিয়ে। অবশ্যই ইতিহাসে নৃশংসতা নিন্দা করা উচিত। মন্দির ধ্বংস, গণহত্যা, লুটপাট বা ধর্মীয় নিপীড়নকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া যায় না। কিন্তু ইতিহাস বোঝার জন্য সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকেও বুঝতে হবে।

মধ্যযুগের একজন সুলতানকে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানের মানদণ্ডে বিচার করলে যেমন ভুল হবে, তেমনি তাঁকে সব অপরাধ থেকে মুক্ত করে ‘আদর্শ শাসক’ বানালেও ভুল হবে। ইতিহাসের কাজ ক্ষমা করা নয়। ইতিহাসের কাজ বোঝা। এমনকি আজকের ভারতীয় উপমহাদেশের বহু মুসলিম ও অমুসলিম পরিবারের সংস্কৃতির মধ্যেও সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ছাপ রয়েছে। এ কারণেই ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনের ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। এটি ভারতীয় সভ্যতার বৃহত্তর বিবর্তনের অংশ।

হাজার বছরের অভিবাসন, যুদ্ধ, বাণিজ্য, ধর্ম, ভাষা, প্রেম, সংঘাত, সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ তৈরি হয়েছে। মুসলিম শাসকরা সেই ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁদের কেউ ছিলেন নির্মাতা, কেউ ছিলেন বিজেতা, কেউ ছিলেন সংস্কারক, কেউ ছিলেন কঠোর শাসক। একই শাসকের মধ্যেও একাধিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে ছিল। তাই ইতিহাসের সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান সম্ভবত কোনো এক পক্ষকে সম্পূর্ণ বিজয়ী ঘোষণা করা নয়। বরং বলা যায় অতীতকে অস্বীকার করে বর্তমানকে বোঝা যায় না। আর অতীতকে ঘৃণা করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনের ইতিহাস তাই শুধু মুসলমানদের ইতিহাস নয়। এটি ভারতবর্ষের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সাম্রাজ্য আসে, সাম্রাজ্য যায়, কিন্তু মানুষের তৈরি সংস্কৃতি অনেক সময় সাম্রাজ্যের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ