সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে কি বাড়ছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ?

আল-শাবাব–আইএস দমনে কঠোর ইথিওপিয়া

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

সোমালিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে আল-শাবাবের যোদ্ধারা যখন ২০২২ সালের জুলাইয়ে ইথিওপিয়ার মাটিতে ঢুকে পড়ে, তখন সেটি ছিল দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। কয়েক দিনের ব্যবধানে সোমালি অঞ্চলের হুলহুল ও ফেরফেরে হামলার চেষ্টা করে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই জঙ্গিগোষ্ঠী। ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী হামলা ঠেকিয়ে দেয়। কিন্তু এর পরের ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, আদ্দিস আবাবার কাছে সন্ত্রাসবাদ কেবল সীমান্তের বাইরের সমস্যা নয়—এটি এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা, সামরিক অভিযান এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

২০২০ থেকে ২০২৬—এই ছয় বছরে ইথিওপিয়া আল-শাবাব ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন, সোমালিয়ায় হাজার হাজার সেনা রাখা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযান এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার—সবই সেই নীতির অংশ।

কিন্তু একই সময়ে দেশটির সরকারকে ঘিরে উঠেছে আরেক ধরনের অভিযোগ। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধীদের আটক, জরুরি অবস্থায় ব্যাপক গ্রেপ্তার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং ২০২৩ সালে অরোমিয়া অঞ্চলে প্রায় ২০টি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—ইথিওপিয়া কি শুধু সহিংস উগ্রবাদ দমন করছে, নাকি নিরাপত্তার ভাষা ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণও বাড়াচ্ছে?

২০২০ সালে ইথিওপিয়ার জন্য আল-শাবাব ও আইএসের হুমকি ছিল সরকারের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসবিরোধী অগ্রাধিকার। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইথিওপিয়া তখন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী অংশীদার হিসেবে সক্রিয় ছিল। একই সময়ে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংস্কার আনে। নতুন আইনে নির্বিচারে তল্লাশি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা সীমিত করা এবং সন্দেহভাজনদের আটকের ক্ষেত্রে কিছু আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে আইনটি সব সময় যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়নি বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে।

২০২০ সালে ইথিওপিয়ায় কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মার্কিন প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়নি। কিন্তু সরকারের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল আল-শাবাব ও আইএসের পাশাপাশি অরোমো লিবারেশন আর্মি বা OLA-সহ জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী।

এখানেই ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা নীতির একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। ‘সন্ত্রাসবাদ’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিদ্রোহ’—দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র একই নিরাপত্তা কাঠামো ব্যবহার করতে শুরু করে।

সরকার একই সঙ্গে সহিংস উগ্রবাদ ঠেকাতে দারিদ্র্য, জাতিগত সংঘাত ও ধর্মীয় উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের কথাও বলেছিল। বিশেষ করে মুসলিম যুবকদের মধ্যে উগ্রবাদী প্রভাব পর্যবেক্ষণের কথা সরকারি কৌশলের অংশ ছিল।

২০২১ সালে ইথিওপিয়ার মাটিতে কোনো সন্ত্রাসী হামলা নথিভুক্ত হয়নি। আল-শাবাব ও আইএসের হুমকি অবশ্যই সরকারের অগ্রাধিকারে ছিল। কিন্তু সে বছর দেশটির নিরাপত্তা নীতির বড় অংশ ঘুরে যায় অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের দিকে।

সরকার মে মাসে TPLF ও OLA-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। পরে নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এর ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

মার্কিন প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি অবস্থার সময়ে দশ হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়। তাদের অনেককে শুধু তিগ্রাই জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক বা তিগ্রাই-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইন তখন আর কেবল আল-শাবাব বা আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছিল না। একই আইন ও নিরাপত্তা কাঠামো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও জাতিগত সংঘাতেও ব্যবহৃত হচ্ছিল।

২০২২ সাল ছিল ইথিওপিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলোর একটি। ২১ জুলাই আল-শাবাব সোমালি অঞ্চলের হুলহুল শহরে হামলা চালায়। চার দিন পর, ২৫ জুলাই, ফেরফেরে দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা করে। দুই ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাহিনী হামলা প্রতিহত করে।

মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-শাবাবের সদস্যরা সীমান্ত পেরিয়ে ইথিওপিয়ায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল। হামলার পর ইথিওপিয়ার ফেডারেল পুলিশ সোমালিয়ায় ঢুকে একটি নিরাপত্তা বাফার জোন তৈরির চেষ্টা করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইথিওপিয়া তখন শুধু নিজের সীমান্ত পাহারা দেয়নি। সোমালিয়ার ভেতরেও আল-শাবাবের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।

২০২২ সালের শুরুতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সোমালিয়া মিশনে ইথিওপিয়ার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা ছিল। যুদ্ধের কারণে পরে কিছু সেনা দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও সোমালিয়া ও কেনিয়া সীমান্তে সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট মোতায়েন অব্যাহত ছিল।

নভেম্বরে ইথিওপিয়ার NISS এবং সোমালিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা আল-শাবাব ঠেকাতে তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযানের জন্য সমঝোতা করে।

আগস্টে সোমালি অঞ্চলের আফদার এলাকায় আল-শাবাবের হামলায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত ও দুজন আহত হন। নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা অভিযান চালিয়ে হামলাকারীকে হত্যা করে।

সেপ্টেম্বরে সোমালিয়ার সাউথ ওয়েস্ট স্টেটে ইথিওপিয়ার সেনাদের ওপর আল-শাবাব আক্রমণ চালায়। জুনে ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ডোলো আদো এলাকায় আল-শাবাবের একটি পরিকল্পিত হামলা নস্যাৎ করা হয়েছে। অক্টোবরে নিরাপত্তা বাহিনী আরও একটি হামলা ঠেকানোর দাবি করে; অভিযানে ৩ হাজার গুলি ও আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহারের জন্য রাখা ছয়টি দাহ্য রাসায়নিকের পাত্র উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

কিন্তু একই বছর দেশের ভেতরে আরেকটি ঘটনা আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায়—মসজিদ ধ্বংস।

অরোমিয়া আঞ্চলিক সরকার শেগার সিটিতে প্রায় ২০টি মসজিদ ভেঙে দেয়। সরকারের যুক্তি ছিল, এগুলো অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা। মুসলিমদের সংগঠন  এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে।

২৬ মে ও ২ জুন আনোয়ার গ্র্যান্ড মসজিদে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ গুলি চালায় বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ৪০ জন আহত হন। পরবর্তী সময়ে ১৪০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ইথিওপিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন। এখানে রাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল—মসজিদগুলো অবৈধ স্থাপনা। অন্যদিকে মুসলিম নেতাদের বক্তব্য ছিল—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভাঙার আগে তাদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত জুনে EIASC ও অরোমিয়া সরকারের মধ্যে সমঝোতা হয়। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের জন্য বিকল্প জমি দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয় এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভাঙার আগে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়ে সমঝোতা হয়।

দেশটির হাজার হাজার সেনা তখনও সোমালিয়ায় অবস্থান করছিল। জুনে সোমালিয়া অভিযোগ করে, ইথিওপিয়ার সেনারা অনুমতি ছাড়া হিরান অঞ্চলে ঢুকেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তখন প্রায় ৩ হাজার ইথিওপীয় সেনা ATMIS-এর অধীনে এবং আরও ৫ থেকে ৭ হাজার সেনা দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থায় সোমালিয়ায় অবস্থান করছিল। সঅর্থাৎ আল-শাবাবের বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার যুদ্ধ কেবল দেশের নিরাপত্তা অভিযান নয়; এটি পুরো হর্ন অব আফ্রিকার ভূরাজনীতির অংশ হয়ে যায়।

১৫ জুলাই ইথিওপিয়ার National Intelligence and Security Service বা NISS ঘোষণা করে, দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে ৮২ জন সন্দেহভাজন আইএস সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

NISS-এর দাবি, তারা সোমালিয়ার পুন্তল্যান্ডভিত্তিক ISIS-Somalia শাখার সঙ্গে যুক্ত এবং পুন্তল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিয়ে ইথিওপিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল।

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ৮২ জনের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন যাদের ইথিওপিয়ার বিভিন্ন স্থানে—আদ্দিস আবাবা ও জিজিগাসহ—চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের গোয়েন্দা, আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।

অভিযানটি শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। NISS-এর অভিযানের আওতায় অরোমিয়া, আমহারা, হারারি, সেন্ট্রাল ইথিওপিয়া ও সোমালি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা আসে।

ইথিওপিয়ার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আল-শাবাবের বিপরীতে আইএসের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক ছিল তুলনামূলকভাবে গোপন ও সেলভিত্তিক।

সরকার দাবি করে, আইএস ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রতীককে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে প্রচার, নিয়োগ এবং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।

আইএসবিরোধী অভ্যন্তরীণ অভিযানের পাশাপাশি আল-শাবাবের বিরুদ্ধে সোমালিয়াতেও ইথিওপিয়ার সামরিক ভূমিকা অব্যাহত থাকে।

২০২৫ সালে AUSSOM-এর কাঠামোয় ইথিওপিয়ার জন্য ২ হাজার ৫০০ সেনা নির্ধারিত হয়। উগান্ডার ৪ হাজার ৫০০, জিবুতির ১ হাজার ৫২০, কেনিয়ার ১ হাজার ৪১০ এবং মিসরের ১ হাজার ৯১ সেনার সঙ্গে ইথিওপিয়ার এই বাহিনী নতুন মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া প্রকাশ্য তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল-শাবাব ও আইএস নিয়ে ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ শেষ হয়নি। বরং সোমালিয়ায় আইএসের শক্ত ঘাঁটি এবং আল-শাবাবের সক্রিয়তা পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক সন্ত্রাসবাদবিষয়ক সরকারি/আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি, ফলে ২০২৬ সালের জন্য ২০২০–২০২৫ সালের মতো নির্ভুল বার্ষিক হামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

দেশটির সর্বশেষ সরকারি আদমশুমারি ২০০৭ সালের। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হিসাবে, ইথিওপিয়ার প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ সুন্নি মুসলিম। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম।

তাই আল-শাবাব ও আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে দেখলে বাস্তবতা বিকৃত হয়। বরং সমস্যা হলো—সন্ত্রাসবিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে রাষ্ট্র কীভাবে ভারসাম্য রাখছে। ২০২৩ সালের মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

সরকার বলেছে, স্থাপনাগুলো অবৈধ। মুসলিম নেতৃত্ব বলেছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের আগে যথাযথ পরামর্শ হয়নি। আর সংঘর্ষের সময় চার মুসলিম বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।

এখানে সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্রনীতি’ অভিযোগ করা যেমন তথ্যের বাইরে যাবে, তেমনি ঘটনাগুলোকে শুধু ‘নগর উন্নয়ন’ বলে পাশ কাটানোও যথেষ্ট নয়। কারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা অভিযান শুধু ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নয়।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মার্কিন সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক প্রতিবেদনগুলোতে বারবার বলা হয়েছে, OLA ও ফানো মিলিশিয়ার মতো জাতিগত-রাজনৈতিক সশস্ত্র গোষ্ঠীই দেশের অভ্যন্তরীণ সহিংসতার বড় উৎস ছিল। এখানে সমস্যা তৈরি হয় যখন একই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো—

২০২৪ সালে রয়টার্সের অনুসন্ধানে অরোমিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের একটি গোপন কমিটির মাধ্যমে বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠে আসে। সরকার OLA-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে; কিন্তু রয়টার্সের অনুসন্ধান দেখায়, বিদ্রোহ দমনের নামে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

২০২৬ সালের Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালেও আমহারা ও অরোমিয়ার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত অব্যাহত ছিল এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। অর্থাৎ প্রশ্নটি কেবল ‘সরকার সন্ত্রাসবাদ দমন করছে কি না’—তা নয়। প্রশ্ন হলো: সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষমতার ওপর কার্যকর বিচারিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কতটা আছে? ইথিওপিয়াকে আল-শাবাব ও আইএসবিরোধী একটি সক্রিয় রাষ্ট্র বলা যায়—এ নিয়ে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।

২০২২ সালে সীমান্তে আল-শাবাবের হামলা ঠেকানো, সোমালিয়ায় হাজার হাজার সেনা মোতায়েন, গোয়েন্দা সহযোগিতা, ২০২৩ সালে হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ এবং ২০২৫ সালে আইএস-সংশ্লিষ্ট ৮২ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা দেখায়, ইথিওপিয়ার সরকার ইসলামি সশস্ত্র উগ্রবাদকে বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি হিসেবেই দেখছে। কিন্তু এই গল্পের দ্বিতীয় অংশটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাসবিরোধী আইন যখন জাতিগত বিদ্রোহ, রাজনৈতিক বিরোধিতা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়; জরুরি অবস্থায় ব্যাপক গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে; অরোমিয়ায় বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ সামনে আসে; কিংবা মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মানুষ নিহত হয়—তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

রাষ্ট্র কি সন্ত্রাসবাদ দমন করছে, নাকি সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতার পরিধি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারেও পরিণত হচ্ছে? ইথিওপিয়ার গত ছয় বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, দুটিই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।

একদিকে আল-শাবাব ও আইএসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অভিযান বাস্তব এবং প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে সেই অভিযানের বাইরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার কতটা আইনসম্মত, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল—সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। আর এখানেই ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা:

মৌলবাদ দমন সফল করতে হলে শুধু জঙ্গি ধরলেই হয় না; সাধারণ মুসলিম নাগরিককে যেন জঙ্গির চোখে না দেখা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। কারণ রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তার নামে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত করে, তাহলে যে বিচ্ছিন্নতা থেকে উগ্রবাদ জন্ম নেয়, সেই সমস্যাই আরও গভীর হতে পারে।

২০২০–২০২৬ সালের তথ্যের আলোকে তাই ইথিওপিয়াকে ‘মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্র’ বলা তথ্যভিত্তিক হবে না; আবার শুধু ‘মৌলবাদবিরোধী সফল রাষ্ট্র’ বললেও পুরো সত্য বলা হবে না। বাস্তব চিত্রটি হলো—একটি রাষ্ট্র একই সঙ্গে জঙ্গিবিরোধী যুদ্ধ করছে এবং নিজের নিরাপত্তা কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যবহারের অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান ও ঘটনাগুলো মূলত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২০–২০২৩ সালের সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি, আফ্রিকান ইউনিয়নের AUSSOM তথ্য, Reuters, Human Rights Watch এবং ইথিওপিয়ার NISS-এর ২০২৫ সালের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের পূর্ণ বছরের পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায় না; তাই আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত যাচাইযোগ্য তথ্যের বাইরে কোনো সংখ্যা যোগ করা হয়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ