বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, নজর রাখতে হবে দূষণে

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 নগরজীবনে প্রতিদিন বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ। একই সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকট। এই পরিস্থিতিতে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ‘বর্জ্য থেকে জ্বালানি’ প্রকল্পকে বর্জ্য কমানো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিটি পরিবেশের জন্য পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে বর্জ্য পোড়ানোর সময় বায়ুদূষণ, ভারী ধাতু, ডাইঅক্সিন-ফিউরান এবং পোড়ানোর পর তৈরি ছাই যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচিও বলছে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর একটি হলো উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্য পোড়ানো। এতে বর্জ্যের আয়তন কমে এবং তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হয়; সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

কিন্তু বর্জ্য পোড়ানোর পরও বর্জ্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তৈরি হয় নিচের দিকে জমা হওয়া ছাই এবং সূক্ষ্ম ছাই। এর মধ্যে ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা বলছে, বর্জ্য পোড়ানোর ছাই যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বর্জ্য পোড়ানোর সময় নির্গত ধোঁয়ার সঙ্গে সূক্ষ্ম কণা, সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো দূষক পরিবেশে যেতে পারে। আধুনিক বর্জ্য পোড়ানোর কেন্দ্রগুলোতে এসব দূষক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের পরিশোধন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে সেই ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত নজরদারি না হলে ঝুঁকি থেকেই যায়।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় ডাইঅক্সিন ও ফিউরান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডাইঅক্সিন অত্যন্ত বিষাক্ত এবং দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যেতে পারে। এটি খাদ্যশৃঙ্খলে জমা হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে প্রজনন ও বিকাশগত সমস্যা, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ক্ষতি, হরমোনের ওপর প্রভাব ও ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য পোড়ানো ডাইঅক্সিন নির্গমনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আধুনিক প্রযুক্তিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই বিপজ্জনক মাত্রায় ডাইঅক্সিন ছড়াবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিয়ন্ত্রিত বর্জ্য পোড়ানোর প্রযুক্তিতে ডাইঅক্সিনের নির্গমন কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। মূল বিষয় হলো প্রযুক্তির মান, পরিচালনা, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরীক্ষা।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো পোড়ানোর পর যে ছাই তৈরি হবে, সেটি কোথায় এবং কীভাবে ফেলা হবে।

বিশেষ করে সূক্ষ্ম ছাই বা ‘ফ্লাই অ্যাশ’-এ ভারী ধাতু জমা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ছাইয়ে ক্যাডমিয়াম, পারদ, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতু থাকার ঝুঁকি রয়েছে। ভুলভাবে সংরক্ষণ বা ফেলে দিলে এসব উপাদান মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পরিবেশগত মূল্যায়নে শুধু চিমনি দিয়ে কতটা দূষিত গ্যাস বের হচ্ছে, সেটি দেখলেই হবে না। ছাই সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় ফেলা হচ্ছে এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের শহরগুলোর বর্জ্যের বড় অংশ জৈব এবং আর্দ্র। এ কারণে বর্জ্য সরাসরি পোড়ানোর উপযোগী করতে বর্জ্য আলাদা করা, শুকানো ও প্রস্তুত করার প্রয়োজন হতে পারে। ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্জ্যের বড় অংশ জৈব হওয়ায় আর্দ্রতা বেশি এবং এর ফলে পোড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য অবদান তুলনামূলক সীমিত হতে পারে। গবেষণাটিতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পোড়ানোর মাধ্যমে ঢাকার বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পূরণের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ঢাকায় ১০ মেগাওয়াটের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিটি নির্দিষ্ট শর্তে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে উচ্চ মূলধন ব্যয়, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি ঢাকার আমিনবাজার প্রকল্প। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠন প্রস্তাবিত ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের প্রকল্পটি বাতিলের দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রকল্পটি বায়ুদূষণ বাড়াতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ ছাই, অতি সূক্ষ্ম কণা, ভারী ধাতু, ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো দূষক তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। তবে এগুলো প্রকল্পবিরোধী সংগঠনগুলোর উত্থাপিত উদ্বেগ; এগুলোকে প্রকল্পের বাস্তব নির্গমন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো, প্রকল্পে কী ধরনের বর্জ্য ব্যবহার করা হবে, বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা থাকবে কি না, চিমনির নির্গমন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং নির্গমন তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে কি না।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে একেবারে বাতিল করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একমাত্র সমাধান হিসেবেও দেখা উচিত নয়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি বলছে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্জ্যের পরিমাণ কমানো ও শক্তি উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু এটি একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত। পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য কমানোর কার্যক্রমের বিকল্প হিসেবে শুধু বর্জ্য পোড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বর্জ্য উৎসে আলাদা করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পুনরুদ্ধার, আধুনিক নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, চিমনির নির্গমন নিয়মিত পরীক্ষা, ছাইয়ের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাধীনভাবে পরিবেশগত নজরদারি।

কারণ বর্জ্যকে মাটির নিচে চাপা দেওয়ার পরিবর্তে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও দূষণের ঝুঁকি শূন্য হয় না। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলো, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে কতটা নিরাপদে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেল তার ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ