ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির তৃণমূলে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। তবে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মোকাবিলার আগে নিজেদের একাধিক প্রার্থী সামলানোই দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একাধিক নেতা দলীয় সমর্থন প্রত্যাশী। কোনো কোনো ইউনিয়নে এই সংখ্যা সাত থেকে ১২ জন পর্যন্ত। ফলে একক প্রার্থী নির্ধারণে সমঝোতা, জনপ্রিয়তা যাচাই এবং দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথেই এগোতে হচ্ছে বিএনপিকে।
নির্বাচন কমিশন বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে কমিশন।
দলের জন্য জটিলতা তৈরি হয়েছে চেয়ারম্যান পদে একাধিক সমর্থনপ্রত্যাশী থাকায়। লক্ষ্মীপুর সদর পশ্চিম থানা বিএনপির অধীন নয়টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে ৫৬৭ জন দলীয় ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী সাতজন।
স্থানীয় নেতাদের অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রার্থিতা নিয়ে আগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু একই ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থী থাকলে দলীয় ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ভোটের মাঠে নামার আগেই নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করতে চাইছে বিএনপি।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে দল-সমর্থিত প্রার্থীকে সামনে রাখার চেষ্টা করা হবে। দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে একজনকে সমর্থন দিয়ে নেতাকর্মীদের তাঁর পক্ষে কাজ করানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রার্থী বাছাইয়ে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদান। এর পাশাপাশি প্রার্থীর স্থানীয় রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় আসবে। বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, শুধু দীর্ঘদিনের দলীয় পরিচয় বা ত্যাগের ভিত্তিতে নয়, অধিকতর যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দলের প্রতি ত্যাগ ও অবদান এবং অধিকতর যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ে আঞ্চলিকতা, গোষ্ঠীগত বিষয় এবং এলাকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দলের নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
একক প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা না হলে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ভূমিকা রাখতে হতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা ও স্থানীয় অবস্থান যাচাই করে একজনকে বেছে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিএনপির জন্য এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন দিক হলো, একজনকে সমর্থন দেওয়ার পর বাকিদের কীভাবে তাঁর পক্ষে আনা যাবে। দীর্ঘদিনের দলীয় নেতা, সাবেক জনপ্রতিনিধি এবং নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নেতাদের মধ্যে সমন্বয় করা সহজ নয়। প্রার্থী বাছাইয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে তা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিরোধ বাড়াতে পারে।
একক প্রার্থী নির্ধারণের পর বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো। দলীয় সমর্থন না পাওয়া কোনো নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। একই সঙ্গে নির্বাচনের পরও দলীয় কোন্দল টিকে থাকতে পারে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সৎ, দলের প্রতি অনুগত, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা রাখেন, তাঁকেই দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে।
তবে শুধু সাংগঠনিক শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো যাবে কি না, তা নিয়ে তৃণমূলে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অনেক প্রার্থীর নিজস্ব কর্মী-সমর্থক ও স্থানীয় প্রভাব রয়েছে। দলীয় সমর্থন না পেলেও তাঁরা নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতায় পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিএনপির প্রার্থী-জটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অনেক ইউনিয়নে আগেভাগেই প্রার্থী ঠিক করার কাজ এগিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়। জাতীয় নাগরিক পার্টিও ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ অবস্থায় বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে প্রতিপক্ষের সুবিধা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেখানে জামায়াতের একজন প্রার্থী এবং বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকবে, সেখানে ভোটের সমীকরণ জটিল হতে পারে। তবে নির্বাচনে কারা অংশ নেবেন এবং কোন ইউনিয়নে কারা প্রার্থী হবেন, তা তফসিল ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার পর আরও স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন কমিশন ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। বছরের শেষ দিকে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা থাকায় রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রস্তুতি বাড়ছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে যেগুলো নির্বাচনের উপযোগী, সেগুলোতে প্রথম ধাপে ভোট হতে পারে।
বিএনপির সামনে এখন তিনটি কাজ একক প্রার্থী নির্ধারণ, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখা। এর মধ্যে প্রথম কাজটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, দ্বিতীয়টি ততটাই কঠিন। কারণ একজনকে সমর্থন দেওয়ার পর অন্যদের পক্ষে আনা না গেলে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্তই দলের জন্য নতুন বিরোধের কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইউপি নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়েরও পরীক্ষা। স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা করে একজনকে সামনে রেখে পুরো সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে দলটি সুবিধা পাবে। আর প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিরোধ বাড়লে নির্বাচনের আগেই দলের শক্তি ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে বিএনপি? বর্তমান প্রস্তুতি ও নেতাদের বক্তব্যে সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণের পথই বেশি স্পষ্ট। তবে যেখানে সমঝোতা হবে না, সেখানে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ এবং দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।