টানা ৬৩ দিন অনশন করে দেশের জন্য আত্মবলিদান দিয়েছিলেন তিনি।স্বয়ং দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন,❝ যতীন হলো এযুগের দধীচি অত্যাচারী ইংরেজ সরকারকে পরাজিত করবার জন্য নিজের অস্থি দিয়ে গেলো। ১৯২১, মাত্র ১৭ বছর বয়স তখন, তখনই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর হাতে দক্ষিণ কলকাতা কংগ্রেস কমিটি গঠন ও পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন – ভাবা যায়! – তিনি যতীন্দ্রনাথ দাস, সকলের যতীন দাস, কলেজের পড়া বন্ধ করে যোগ দিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে।
১৯২৯ সালের ৬ জুন দিল্লীর এ্যাসেমব্লি হলে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত বোমা ফেলে ব্রিটিশ শাসন আইনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ করে গ্রেপ্তার হন। সেইসূত্রে ১৯২৯ সালের ১৪ জুন কলকাতার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন যতীন দাস, ১৬ জুন তিনি লাহোর জেলে আসেন। শুরু হয় ভগৎ সিং, রাজগুরু, শুকদেব সহ যতীন দাসের মামলা। এই মামলাই পরে ‘থার্ড লাহোর কন্সপিরেসি কেস’-এ পরিণত হয়। অবশ্য্য যতীন দাস তখন ব্রিটিশ আইন আদালতকে পা দিয়ে চূর্ণ করে চলে গেছেন অনেক দূরে।
১৯২৯ সালে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ধরা পড়েন যতীন দাস। লাহোর জেলে ভগত সিং, বটুকেশ্বর দত্ত সহ এদের সবাইকে রাখা হলো পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে। অবর্ণনীয় সেখানকার পরিবেশ, রান্নাঘরে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে টিকটিকি আরশোলা ইঁদুর সেই সাথে অখাদ্য খাবার। কয়েদীদের না আছে কাপড় কাচার সুযোগ না তাদের দেওয়া হয় কোন বই বা পত্রিকা। অথচ পাশের ইউরোপীয়ান ওয়ার্ডে VIP ব্যবস্থা। এরই প্রতিবাদে যতীন শুরু করলেন অনশন।
ভগৎ সিং ও তাঁর জেলে-বন্দী বিপ্লবী দল জেলেতে রাজনৈতিক-বন্দি’দের জন্য খুব সাধারণ কিছু সুবিধা দাবী করেছিলেন ব্রিটিশ পাঞ্জাব গভর্নমেন্টের কাছে। খুব সাধারণ এজন্য যে দাবীতে ছিল – রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য একটু পরিস্কার উপযুক্ত খাবার, সংবাদপত্র বা বই পড়তে দেওয়া, কোনও বন্দির শরীর-স্বাস্থ্য অনুযায়ী তাকে জেলেতে কাজ দেওয়া, এইসব। পাঞ্জাব গভর্নমেন্ট কিছুই মানবে না বলে দিল। দাবী আদায়ে ১৩ জুলাই, ১৯২৯, লাহোর সেন্ট্রাল জেলে শুরু হয় ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট।
যতীন দাস বলেছিলেন,—❝ একবার অনশন শুরু করলে দাবী সম্পূর্ণ মানা না হওয়া পর্যন্ত আমার অনশন চলবে, এবং আমৃত্যু অনশন চলবে।❞
ব্রিটিশ সরকার প্রথমে ব্যাপারটা হালকা-ভাবে নিলেও যখন দেখলো অবস্থা হাতের বাইরে যাচ্ছে, তখন প্রথমে জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু ফল কিছু হ’ল না। উল্টে অনশনের ধারাবাহিক খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ হতে লাগল, সারা দেশে উৎকণ্ঠা ও উত্তাপ – দুই বাড়ল। ফলে ১৬ আগস্ট পাঞ্জাব গভর্নমেন্ট ❝জেল এনকোয়ারি কমিটি❞ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করল। কিন্তু যেহেতু দাবী তখনও মানা হয়নি, তাই যতীন দাস থামলেন না, কারুর কথাও শুনলেন না।
১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯। লাহোর বোস্টাল জেলের ভেতরে ডাক্তার আর অফিসারদের ভিড়। স্তব্ধ হয়ে এসে দাড়ালেন বন্ধুরা – বিজয় কুমার সিংহ, জিতেন্দ্র নাথ সান্নাল ও অজয় ঘোষ। সূর্য একটু একটু করে উঠছে। ১৩ জুলাই থেকে ইংরেজ বিরোধী যে বিস্ময়কর অনশনের শুরু ১৩ সেপ্টেম্বর ৬৩ দিনের মাথায় বেলা ১:০৫ মিনিটে হ’ল তার চির সমাপ্তি।
রক্ত গোলাপের স্তুপে ঢেকে দেওয়া হ’ল যতীন্দ্রনাথ দাসের নশ্বর দেহ। রাজবন্দীরাই বহন করে নিয়ে গেলেন জেল গেট পর্যন্ত। বাইরে পাঞ্জবের নেতৃবৃন্দ অপেক্ষা করছেন সাথে হাজার হাজার জনগণ। প্রতিটি মানুষের চোখে জল, শহীদের অপরাজিত আত্মাকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। বিকেল চারটেয় শহীদের দেহ’কে বহন করে এক অভূতপূর্ব শোভাযাত্রা শহরের পথে অগ্রসর হ’ল। প্রায় কয়েক লাখ লোকের বিশাল শোক মিছিল যা প্রায় এক-মাইল দীর্ঘ লম্বা।
যতীন দাসের দেহ নিয়ে ❝লাহোর এক্সপ্রেস❞ বিকেলে দিল্লি পৌছলে দিল্লি শহর ভেঙে পড়লো স্টেশানে। ফুল আর ফুলের মালা দিয়ে অগনিত মানুষের মুখে ধ্বনিত হল, ❝ইনকিলাব জিন্দাবাদ❞ .. ❝যতীন দাস জিন্দাবাদ❞। দিল্লি থেকে রাত্রি আড়াইটের ট্রেন কানপুরে পৌছলে বিপুল জনতার সাথে বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ’রা যতীন দাসের দেহের সামনে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন।