একসময় নদী, খাল ও জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ঢাকা। বৃষ্টির পানি খাল দিয়ে নদীতে গিয়ে পড়ত, জলাভূমি ধরে রাখত অতিরিক্ত পানি। কিন্তু কয়েক দশকের দখল, ভরাট, বর্জ্য ফেলা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এখন প্রায় অচল। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে বছরের বড় সময়জুড়ে বায়ু ও পানি দূষণের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে।
সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) জানিয়েছে, ঢাকার ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টিরই এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল দখলের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে গেছে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, একসময় ঢাকায় প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার খাল ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১২৪ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ রাজধানীর ঐতিহাসিক খাল নেটওয়ার্কের প্রায় ৬৪ শতাংশই এখন আর আগের অবস্থায় নেই। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্ষা এলেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে যাওয়ার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন না নগর পরিকল্পনাবিদেরা। খাল ও জলাভূমি সংকুচিত হওয়া, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্যে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে জলাবদ্ধতার বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
চলতি বছরের জুলাইয়ে কয়েক দফা বৃষ্টির পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায়ও একই চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর খাল ও জলাধার হারিয়ে যাওয়ায় শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ঢাকা ওয়াসার স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানেও রাজধানীর প্রাকৃতিক খালগুলো দখল ও ভরাটের ঝুঁকিতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রায় ৪৫টি প্রাকৃতিক খালের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো শহরের পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুধু দখল নয়, রাজধানীর পানি দূষণের বড় উৎসও এসব খাল ও নদী। চলতি আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক বৈঠকে জানানো হয়, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে বর্জ্য ফেলছে এমন ২২৪টি নির্গমনস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গার পাশে ১৬৬টি এবং তুরাগের পাশে ৫৮টি।
এসব উৎসের সঙ্গে বেসরকারি শিল্পকারখানার পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কথাও জানানো হয়েছে। দূষণ বন্ধে অবৈধ বর্জ্য নির্গমনস্থল বন্ধ, শিল্পকারখানায় কার্যকর বর্জ্য শোধন এবং নদী ও সংযুক্ত খালের পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে আরও গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ঢাকায় মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপের মাধ্যমে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। আর অপরিশোধিত বর্জ্য ও পয়োবর্জ্যের ৮০ শতাংশের বেশি ঢাকার আন্তঃসংযুক্ত নদী ও জলপথে গিয়ে পড়ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে আটকে গেছে।
পানি ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ঢাকার আরেক বড় সংকট বায়ুদূষণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বার্ষিক গড় PM2.5-এর ঘনত্ব প্রায় ৯০–১০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার পর্যন্ত থাকে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মানের তুলনায় কয়েক গুণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিকার তুলনায় প্রায় ১৮–২০ গুণ বেশি।
রাজধানীতে নির্মাণকাজ, যানবাহনের ধোঁয়া, সড়কের ধুলা, শিল্পকারখানা, ইটভাটা ও বর্জ্য পোড়ানো—সব মিলেই বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বৃহত্তর ঢাকা এলাকার PM2.5 দূষণের স্থানীয় উৎসগুলোর মধ্যে গৃহস্থালি কার্যক্রম, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও ইটভাটা, সড়ক পরিবহন এবং পৌর বর্জ্য পোড়ানোর উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৯ সালে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং ২৫০ কোটির বেশি অসুস্থতার দিন তৈরি হয়েছিল বলে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর স্বাস্থ্যগত অর্থনৈতিক ব্যয় ওই বছর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমান ছিল।
রাজধানীর খালগুলো দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধারে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৫৬টি খাল দখলমুক্ত করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৯টি খাল রয়েছে। দখলমুক্তির পর সীমানা নির্ধারণ ও দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে রাজধানীর ২৬টি খালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর পাঁচ বছরেও কোনো একটি খালকে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক ঢাকার পানি দূষণ কমানো, স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদী–খাল পুনরুদ্ধারে ৩৭ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। এই কর্মসূচির আওতায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা এবং ৫ লাখ মানুষকে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ জোরদার, শিল্পকারখানার নির্গমন পর্যবেক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস ও নির্গমন পরীক্ষা এবং ঢাকায় ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার পরিবেশগত সংকটগুলো আলাদা নয়—দখল, দূষণ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়ুদূষণ একে অন্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। খাল দখল হলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়; খালে বর্জ্য ফেললে পানিপ্রবাহ কমে যায়; অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন নদী ও জলাশয়কে দূষিত করে; আর অপরিকল্পিত নির্মাণ বাড়ায় ধুলা ও বায়ুদূষণ।
ফলে শুধু খাল খনন কিংবা বৃষ্টির সময় পানি পাম্প করে সরিয়ে দিলেই রাজধানীর সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন খালের সীমানা স্থায়ীভাবে রক্ষা, দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, শিল্প ও পয়োবর্জ্যের শোধন নিশ্চিত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের আওতায় আনা।
ঢাকার ৫৬টি খাল পুনরুদ্ধারের সরকারি উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ খাল ফিরে না এলে জলাবদ্ধতা, নদী–খাল দূষণ ও পরিবেশগত সংকট থেকে রাজধানীবাসীর মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা না হলে বাসযোগ্য নগরীর সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।