৩৪৭ বছরের পুরোনো হাজী শাহবাজ মসজিদ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার একটি—হাইকোর্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দোয়েল চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মোগল আমলের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জাতীয় তিন নেতার মাজারের ঠিক পেছনে থাকা হাজী খাজা শাহবাজ মসজিদ ঢাকার প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি ১৬৭৯ সালে নির্মিত। অর্থাৎ ২০২৬ সালে এর বয়স দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪৭ বছর। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনও এটিকে তিন নেতার সমাধিসৌধের পাশের ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। মসজিদটির নির্মাতা ছিলেন হাজী খাজা শাহবাজ খান—ঢাকার মোগল আমলের একজন ধনী ব্যবসায়ী। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁকে কাশ্মীর থেকে আগত ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি রমনা এলাকায় এসে এই মসজিদ ও নিজের সমাধি নির্মাণ করেন বলে প্রচলিত ইতিহাসে পাওয়া যায়।

মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল মোগল আমলে বাংলার সুবেদার শাহজাদা মুহাম্মদ আজমের সময়। স্থাপনাটির স্থাপত্যে উত্তর ভারতীয়-মোগল রীতির প্রভাব স্পষ্ট। মসজিদটি একটি উঁচু বেদির ওপর নির্মিত এবং এর রয়েছে তিনটি গম্বুজ। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির মিনার। স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ ও গম্বুজের নকশা এখনো এর কয়েক শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

মসজিদের সঙ্গে রয়েছে হাজী খাজা শাহবাজের সমাধি। ফলে এটি শুধু নামাজের স্থান নয়; একই সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও সমাধি-কমপ্লেক্স। মসজিদটির অবস্থানও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আশপাশে একদিকে হাইকোর্ট, অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শিশু একাডেমি ও জাতীয় তিন নেতার সমাধিসৌধ।

আজকের ঢাকায় মসজিদটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই যেন তার আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় তিন নেতার মাজারের উঁচু স্থাপত্যকাঠামোর কারণে মসজিদটি অনেকটা দৃষ্টির আড়ালে পড়ে গেছে। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মসজিদের পশ্চিম পাশে তিন নেতার মাজার, দক্ষিণে শিশু একাডেমি, পূর্বে হাইকোর্ট এবং উত্তরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্থাপনা রয়েছে। ফলে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ভিড়ে কয়েক শত বছরের পুরোনো এই মসজিদটি অনেকের চোখেই পড়ে না।

মসজিদটিতে যাওয়ার বর্তমান পথও সরাসরি প্রধান সড়ক থেকে নয়। তিন নেতার মাজারের উত্তর পাশের সীমানা ঘেঁষে একটি পথ মসজিদের প্রধান ফটকের দিকে গেছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মসজিদটি তিন নেতার মাজারের সমসাময়িক স্থাপনা নয়। হাজী শাহবাজ মসজিদ নির্মিত হয় ১৬৭৯ সালে, মোগল আমলে। এর প্রায় তিন শতক পরে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের সমাধিকে ঘিরে তিন নেতার মাজার গড়ে ওঠে।

ফজলুল হক ১৯৬২ সালে মারা যাওয়ার পর তাঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী এবং ১৯৬৪ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনকেও একই এলাকায় সমাহিত করা হয়। পরে তিন নেতার স্মৃতিকে ঘিরে সমাধিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালে বর্তমান মাজারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।

অর্থাৎ, একই এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা দুটি স্থাপনার ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের—একটি মোগল আমলের ১৭শ শতকের মসজিদ, অন্যটি ২০শ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মারক।

হাজী শাহবাজ মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি ঢাকার নগর ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। মোগল আমলের রমনা এলাকার ইতিহাস, ঢাকার প্রাচীন স্থাপত্য এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাস—সবকিছুর সঙ্গে এই স্থানটির ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন মসজিদটিকে তিন নেতার সমাধির পাশের ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারি ঢাকা জেলা তথ্যেও বলা হয়েছে, মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে শিলালিপির অভাবে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও ঐতিহাসিকদের অনুমান এটি সপ্তদশ শতকের শেষ থেকে অষ্টাদশ শতকের শুরুর সময়ের স্থাপনা।

তাই হাইকোর্টের পেছনে, তিন নেতার মাজারের আড়ালে থাকা এই মসজিদটি আসলে ঢাকার প্রায় সাড়ে তিন শত বছরের ইতিহাসের জীবন্ত নিদর্শন—যে ইতিহাস আধুনিক নগরীর ব্যস্ততার মধ্যে অনেকটাই চোখের আড়ালে চলে গেছে।

এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন ছাত্র শিবলী দৈনিক প্রকৃতির সংবাদকে বলেন, সাড়ে তিনশত বছরের পুরনো মসজিদ এটি। যেহেতু সামনে তিন নেতার মাজার পেছনে হাইকোর্ট তাই অনেকেই এটাকে খেয়াল করেনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ