বন উজাড় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভূমিচিত্র
বাংলাদেশের প্রকৃতিতে একদিকে কমছে গাছপালা ও বনভূমি, অন্যদিকে বাড়ছে জলাবদ্ধতা, প্লাবিত এলাকা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি। বন হারানোর পাশাপাশি কৃষিজমি, নিচু এলাকা ও বসতভূমির ভূমি ব্যবহারে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদীভাঙন, জলাভূমি দখল এবং বন উজাড় সব মিলিয়ে দেশের ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনায় তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ।
স্যাটেলাইটভিত্তিক বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৪৬ হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে। ২০০০ সালের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ ওই সময়ের বৃক্ষ আচ্ছাদনের প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালেও প্রায় ১৫ হাজার ৯২৯ হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারানোর হিসাব পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদন কমার প্রবণতা স্পষ্ট। বন উজাড়ের পাশাপাশি বসতি, শিল্পকারখানা, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে।
ঢাকা জেলার ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের ভূমি ব্যবহারের ওপর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ বছরে শহুরে নির্মিত এলাকা বেড়েছে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমেছে ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তবে এই গবেষণায় জলাভূমি বা জলাধারের পরিমাণও ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ‘বাড়ছে জল’ বলতে মূলত স্থায়ী জলাশয় বাড়ার চেয়ে বর্ষার পানি জমে থাকা, জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের ঝুঁকি বৃদ্ধিকে বোঝানো বেশি যুক্তিযুক্ত।
বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ দেশে পানির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন। কিন্তু স্বাভাবিক জলাভূমি ও নদীর পানি এবং অপরিকল্পিতভাবে জমে থাকা পানি এক বিষয় নয়। জলাভূমি ভরাট, খাল দখল, নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং নগরায়ণের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে না পারলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই তৈরি হয় জলাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর চাপের কথা উঠে এসেছে।
অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের কারণে অনেক জায়গায় স্থলভাগের চরিত্রও বদলাচ্ছে। উপকূলীয় বাংলাদেশের ভূমি ও জলভাগের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে গবেষণায় ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের স্থলভাগ ও জলভাগের অনুপাত পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি সুন্দরবনও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বনটির ওপর একদিকে মানুষের জীবিকা ও সম্পদ আহরণের চাপ রয়েছে, অন্যদিকে লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব রয়েছে।
সুন্দরবন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বনভূমি ও উপকূলীয় ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে শুধু নতুন করে গাছ লাগানো নয়, বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন ও তার জলাভূমি-নির্ভর প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বন শুধু কাঠ বা গাছের সমষ্টি নয়। গাছ মাটিতে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, বৃষ্টির পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মাটির ক্ষয় কমায়। শহর ও গ্রাম দুই জায়গাতেই প্রাকৃতিক সবুজ কমে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটিতে প্রবেশের সুযোগ কমে যায়। ফলে অল্প সময়ে বেশি পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে গাছপালা কমে গেলে স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়। বিশেষ করে দ্রুত বাড়তে থাকা শহরগুলোতে ভবন, সড়ক ও কংক্রিটের বিস্তার এবং সবুজ এলাকার সংকোচন নগর তাপমাত্রা ও পরিবেশগত চাপ বাড়াতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, বন রক্ষাকে শুধু বন বিভাগের কাজ হিসেবে দেখলে হবে না। ভূমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং শিল্পায়নের নীতির সঙ্গে বন সংরক্ষণকে সমন্বিত করতে হবে।
একই সঙ্গে কোন এলাকায় কতটুকু বন, কৃষিজমি, জলাভূমি ও নির্মিত এলাকা রয়েছে তার নিয়মিত স্যাটেলাইটভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে ভূমির পরিবর্তন কোথায় দ্রুত হচ্ছে, কোথায় বন উজাড় হচ্ছে কিংবা কোথায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে, তা সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় তাই প্রশ্নটি শুধু ‘বন কমছে কি না’ বা ‘পানি বাড়ছে কি না’ এত সরল নয়। কোথাও জলাশয় ভরাট হয়ে পানি কমছে, কোথাও নদীভাঙনে বসতভিটা পানিতে যাচ্ছে, আবার কোথাও বন উজাড় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বৃষ্টির পানি আটকে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। অর্থাৎ প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য কমছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ভূমি পরিবর্তন।
বন রক্ষা, খাল-নদী পুনরুদ্ধার, জলাভূমি দখল বন্ধ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ‘কমছে বন, বাড়ছে জল’ শুধু একটি পরিবেশগত সংকটের শিরোনাম থাকবে না,এটি হয়ে উঠতে পারে মানুষের বসতি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বড় ঝুঁকি।