১৬২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাপানে খ্রিস্টান নিপীড়নের ভয়াবহ অধ্যায়

গ্রেট গেন্না শাহাদাত: নাগাসাকিতে এক দিনে ৫৫ খ্রিস্টানের মৃত্যুদণ্ড

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ধর্মীয় নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছিল ১৬২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাপানের নাগাসাকিতে। ওই দিন শহরের নিশিজাকা পাহাড়ে ৫৫ জন খ্রিস্টানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ধর্মযাজক, ধর্মপ্রচারক, সাধারণ অনুসারী এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় মানুষও ছিলেন। এই ঘটনা ইতিহাসে ‘গ্রেট গেন্না মার্টারডম’ বা ‘গ্রেট গেন্না শাহাদাত’ নামে পরিচিত। জাপানের সরকারি পর্যটন-ঐতিহ্যবিষয়ক তথ্যেও ১৬২২ সালের এই ঘটনায় ৫৫ জন ক্যাথলিককে আগুনে পুড়িয়ে ও শিরশ্ছেদ করে হত্যা করার তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

জাপানে খ্রিস্টধর্মের বিস্তার শুরু হয়েছিল ১৬ শতকের মাঝামাঝি। ১৫৪৯ সালে জেসুইট ধর্মপ্রচারক ফ্রান্সিস জেভিয়ার জাপানে পৌঁছানোর পর সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে বিশেষ করে নাগাসাকি ও আশপাশের অঞ্চলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

কিন্তু জাপানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টানদের অবস্থাও কঠিন হয়ে পড়ে। তৎকালীন শাসকেরা বিদেশি ধর্মপ্রচারকদের রাজনৈতিক প্রভাব ও বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন।

শেষ পর্যন্ত ১৬১৪ সালে জাপানজুড়ে খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করার নির্দেশ জারি করা হয়। ধর্মপ্রচারকদের দেশ ছাড়তে বলা হয় এবং গির্জাসহ খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করা হয়। এরপরও অনেক ধর্মপ্রচারক গোপনে জাপানে থেকে যান কিংবা পুনরায় প্রবেশ করে গোপনে ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

গ্রেট গেন্না শাহাদাতের পেছনে ১৬২০ সালের একটি ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জাপানি জাহাজের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনায় দুই খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের জাপানে গোপনে প্রবেশের বিষয়টি সামনে আসে। তদন্তের পর ধর্মপ্রচারক ও তাঁদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়।

জাপানি কর্তৃপক্ষ এরপর খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের আশ্রয় দেওয়া বা তাঁদের কার্যক্রমে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে। নাগাসাকির তৎকালীন প্রশাসন খ্রিস্টধর্ম নির্মূলের অভিযান আরও জোরদার করে।

১৬২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নাগাসাকির নিশিজাকা পাহাড়ে ওই ৫৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৩০ জনকে শিরশ্ছেদ করা হয় এবং ২৫ জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মযাজক ও সহযোগী ছাড়াও নারী ও শিশুও ছিলেন।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে জাপানি ছাড়াও কোরীয় ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের সদস্য—বিশেষ করে জেসুইট, ফ্রান্সিসকান ও ডমিনিকান সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরাও এই মৃত্যুদণ্ডের শিকার হন। পর্তুগিজ সম্প্রসারণবিষয়ক ঐতিহাসিক তথ্যভান্ডারেও ৫৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ২৪ জন ছিলেন ধর্মীয় ব্যক্তি।

খ্রিস্টধর্মের ওপর জাপানি শাসকদের কঠোর অবস্থানের পেছনে শুধু ধর্মীয় কারণ ছিল না। তৎকালীন জাপানের শাসকেরা বিদেশি ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কাও করতেন।

টোকুগাওয়া শোগুনাত জাপানের রাজনৈতিক ঐক্য ও নিজস্ব শাসনব্যবস্থা সুসংহত করতে বিদেশি প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল। খ্রিস্টধর্মকে তারা সম্ভাব্য রাজনৈতিক আনুগত্যের বিকল্প কেন্দ্র হিসেবেও দেখেছিল। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বিদেশি যোগাযোগের বিষয়টিও নিপীড়নের কারণ হয়ে ওঠে।

জাপানের সরকারি ঐতিহ্যবিষয়ক নথিতে বলা হয়েছে, ১৬১৪ সালের নিষেধাজ্ঞার পর গোপনে থাকা ধর্মপ্রচারকদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তাঁদের আশ্রয়দাতাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়।

১০ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ড ছিল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ১৭ শতকের প্রথমার্ধে জাপানে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়। ১৬১৯ সালে কিয়োটোতে ৫২ জন সাধারণ খ্রিস্টানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৬২২ সালে নাগাসাকির গ্রেট গেন্না শাহাদাত এবং ১৬২৩ সালে এডোর গ্রেট মার্টারডমের মতো ঘটনা ঘটে।

১৬২২ সালের হত্যাকাণ্ডের পরও খ্রিস্টানদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ হয়নি। পরবর্তী বছরগুলোতে ধর্মত্যাগে বাধ্য করা, নির্যাতন এবং খ্রিস্টানদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন কঠোর পদ্ধতি চালু করা হয়। ১৬২৮ সালে ধর্মীয় বিশ্বাস যাচাইয়ের জন্য খ্রিস্টানদের পবিত্র প্রতীকের ওপর পা দিতে বাধ্য করার ‘এফুমি’ পদ্ধতিও চালু করা হয়।

গ্রেট গেন্না শাহাদাত জাপানের খ্রিস্টান নিপীড়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে একই দিনে ৫৫ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁদের মধ্যে ধর্মযাজক থেকে শুরু করে সাধারণ নারী-শিশু পর্যন্ত থাকার কারণে ঘটনাটি খ্রিস্টান বিশ্বের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এই ঘটনার বিবরণ দ্রুত জাপানের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। সমসাময়িক ধর্মীয় লেখক ও মিশনারিরা ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন। পরে ইউরোপে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে ১৬২২ সালের নাগাসাকির হত্যাকাণ্ডের বিবরণ আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়। আধুনিক গবেষণাতেও ১০ সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে গ্রেট গেন্না মার্টারডম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৬২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের সেই ঘটনা তাই শুধু ৫৫ জন মানুষের মৃত্যুর ইতিহাস নয়; এটি জাপানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং বিদেশি প্রভাবের সংঘাতের এক নির্মম অধ্যায়। নাগাসাকির নিশিজাকা পাহাড় আজও সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ