প্রতিদিন ১,৫০০ রোগী, ঝরছে ৪ প্রাণ, সামনে আরও দুই মাসের শঙ্কা

ডেঙ্গুর ভয়ংকর ছোবল

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশে ফের ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায়ও দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন গড়ে চারজন। চলতি বছরের আগস্টেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী। সেপ্টেম্বরের প্রথম ছয় দিনেও সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং সামনে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ দুই মাস—নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ১২৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ২১৮ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩০ জনের।

নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায়। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৯৬ জন, ঢাকা দক্ষিণে ১৩৪ জন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ৪০৮ জন, ময়মনসিংহে ৭৭ জন, চট্টগ্রামে ১১৭ জন, খুলনায় ২৪২ জন, রাজশাহীতে ১১৬ জন, রংপুরে ৭১ জন, বরিশালে ১৪২ জন এবং সিলেটে ৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও। চলতি বছরের জুনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে তা আরও দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও আক্রান্তের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ৪১৩ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখের বেশি মানুষ। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ। ওই বছর প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে জ্বরের রোগীর চাপ। রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চার বছরের শিশু মারিয়াকে নিয়ে এসেছেন তার মা মারুফা বেগম। তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে শিশুটি। ডেঙ্গুর আশঙ্কায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে।

মারুফা বেগম জানান, তাদের পরিবারের প্রায় সবাই জ্বরে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হাসপাতালে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

হাসপাতালের বহির্বিভাগেও বেড়েছে রোগীর চাপ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এক মাস আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ রোগী ওষুধ নিতে আসতেন, এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বেশির ভাগ শিশুর জ্বর, শরীরে র‌্যাশ ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেকের ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেও উপসর্গ থাকায় তাদের আরও বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর থেকে তিন বছরের শিশু তামান্নাকে নিয়ে এসেছেন তার বাবা রিয়াজ উদ্দিন। শিশুটির মায়েরও জ্বর রয়েছে। ডেঙ্গু নাকি হাম—এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারটি।

 *মশা মারলেই সমাধান নয়, বন্ধ করতে হবে প্রজনন*

ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির পেছনে মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতিকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে এমনভাবে সুরক্ষিত রাখা, যাতে তাকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি।

তার মতে, শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের ওপর নির্ভর করলে স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ প্রজননস্থল ধ্বংস না হলে সেখান থেকেই নতুন মশা জন্ম নেবে। তাই মশা মারার চেয়ে মশার উৎপাদন বন্ধ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আশঙ্কা করছেন, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ঐতিহাসিকভাবেই ডেঙ্গুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ড. কবিরুল বাশারের পরামর্শ, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান না চালিয়ে প্রজননস্থল, মশার ঘনত্ব এবং রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে তথ্যভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা—তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

 *দেশজুড়ে একযোগে অভিযান চান বিশেষজ্ঞরা*

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, শুধু রাজধানী নয়, ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত একযোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তার মতে, টানা দুই থেকে তিন দিন ব্যাপকভাবে কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি বছরে অন্তত দুবার এ ধরনের অভিযান প্রয়োজন।

তিনি এডিস মশার আবাস ও ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার করা, বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর প্রাপ্তবয়স্ক ও লার্ভা নিধনকারী ওষুধ ব্যবহার, এলাকাভেদে কার্যকর ওষুধ নির্বাচন এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, আনসার-ভিডিপি, রাজনৈতিক কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিও কর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ডেঙ্গুর টিকা চালু এবং বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চালু রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

 *তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি সরকারের*

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তিন মাসের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাস ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় হওয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদেরও কর্মসূচিতে যুক্ত করা হবে।

মহানগর এলাকায় কর্মসূচির সমন্বয় করবে সিটি করপোরেশন। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাসেবক, স্কাউট, বিএনসিসি, গার্ল গাইড, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবক এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেবেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—শুধু তিন মাসের পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি দিয়ে কি ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব? তাদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন ও মৌসুমি অভিযান নয়; প্রয়োজন বছরজুড়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার সমন্বিত ব্যবস্থা।

কারণ প্রতিদিন যখন দেড় হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং প্রাণ হারাচ্ছেন একাধিক মানুষ, তখন ডেঙ্গু আর কেবল মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়—এটি ক্রমেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকেতে পরিণত হচ্ছে। সামনে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের দুই মাস। এই সময়টিতেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ