১২ ঘণ্টার জন্য যৌন সম্পর্ক করতে পারবে অবিবাহিতরা! অদ্ভুত গল্পের সিনেমা

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

এমন একটি পৃথিবী, যেখানে প্রেম করা অপরাধ নয়, কিন্তু বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক আইনত নিষিদ্ধ। সারা বছর ধরে সেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে। কেবল বছরে একটি নির্দিষ্ট রাত—মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য সরকার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। অবিবাহিত মানুষ ওই রাতেই কেবল আইন ভাঙার ভয় ছাড়াই যৌন সম্পর্ক করতে পারে। এরপর আবার আগের নিয়ম।

শুনতে যেন কোনো রাজনৈতিক ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসের কাহিনি। কিন্তু এই অদ্ভুত ধারণাকেই রোমান্টিক কমেডির মোড়কে পর্দায় এনেছেন পরিচালক উইল গ্লাক। তাঁর নতুন ছবি ‘ওয়ান নাইট অনলি’ এমন এক পৃথিবীর গল্প বলে, যেখানে রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, এমনকি শারীরিক সম্পর্কের সময়ও নির্ধারণ করে দেয়। ৭ আগস্ট মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি। আর মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত জীবন
ছবির শুরুতেই দর্শককে জানানো হয়, কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে একটি কঠোর আইন পাস হয়েছে। সেই আইনে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে সরকার বছরে একটি নির্দিষ্ট দিনকে ঘোষণা করেছে ‘ন্যাশনাল সেক্স নাইট’। ওই দিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য অবিবাহিত মানুষ আইনিভাবে যৌন সম্পর্ক করতে পারে।

শুধু তা–ই নয়, সবাইকে উন্নত প্রযুক্তির একটি বায়োসেন্সর বা ট্র্যাকিং ডিভাইস পরতে হয়। সেটি শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তন শনাক্ত করে বুঝতে পারে, কেউ যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছে কি না। বিয়ে না করে অন্য সময় আইন ভাঙলে অপেক্ষা করে কঠোর শাস্তি। এই একটি ধারণাই ছবির পুরো পৃথিবীকে অন্য রকম করে তোলে।

বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাত
এই বিশেষ রাতকে কেন্দ্র করে সমাজজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। কেউ বহুদিনের প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে রাত কাটানোর পরিকল্পনা করে। কেউ নতুন সঙ্গী খুঁজতে বের হয়। ডেটিং অ্যাপগুলো হয়ে ওঠে সবচেয়ে ব্যস্ত। রেস্তোরাঁ, বার, পার্টি—সব জায়গায় ভিড়। পুরো শহর যেন ভালোবাসা, কামনা আর স্বাধীনতার ক্ষণিক উৎসবে মেতে ওঠে।

ওভেনের ভেঙে যাওয়া পরিকল্পনা
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ওভেন। ম্যানহাটনে একটি ছোট পিৎজারিয়া চালায় সে। শান্ত, ভদ্র, কিছুটা সাদাসিধে স্বভাবের মানুষ। বছরের সেই বিশেষ রাতটি কাটানোর জন্য তারও পরিকল্পনা ছিল। দীর্ঘদিনের প্রেমিকা মালিকার সঙ্গে রাত কাটানোর কথা। কিন্তু দেখা হওয়ার পর মালিকা এমন একটি কথা বলে, যা ওভেনের পুরো পৃথিবী ওলট–পালট করে দেয়। সে জানায়, এবার সে ওভেনের সঙ্গে নয়, অন্য একজনের সঙ্গে রাত কাটাতে চায়। সম্পর্ককে আরও খোলামেলা করে দেখতে চায় সে। মুহূর্তের মধ্যে ওভেন একা হয়ে যায়।

‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অ্যালির রাতও ভালো যাচ্ছে না
অন্যদিকে অ্যালি একজন গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। তারও পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যার সঙ্গে বের হওয়ার কথা ছিল, সে হঠাৎ অন্য কারও সঙ্গে চলে যায়। ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একাই বেরিয়ে পড়ে অ্যালি। বন্ধুর দেওয়া ঝলমলে পোশাক পরে সে যোগ দেয় শহরের সেই উন্মাদনায়।

প্রথম দেখা, প্রথম বিপত্তি
ওভেন আর অ্যালির প্রথম দেখা খুব একটা সুখকর হয় না। প্রেমিকার আচরণে ভেঙে পড়ে ওভেন কয়েক পেগ পানীয় খেয়ে ফেলেছিল। ফলে অ্যালির সামনে দাঁড়িয়েই প্রায় বমি করে ফেলে। অ্যালি বিরক্ত হয়ে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, এখানেই গল্প শেষ। বারবার দেখা, বারবার দূরে সরে যাওয়া নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাতজুড়ে বারবার দেখা হতে থাকে দুজনের। এরপর কী হয়, তা নিয়েই এগিয়েছে সিনেমাটির গল্প।

আলোচিত সিনেমাটির প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যালাম টার্নার ও মনিকা বারবারো। ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি দুই প্রধান অভিনেতা। ক্যালাম টার্নার ওভেন চরিত্রে সহজ-সরল, আন্তরিক এক তরুণকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। অন্যদিকে মনিকা বারবারো অ্যালিকে প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং একই সঙ্গে সংবেদনশীল করে তুলেছেন। দুজনের খুনসুটি, সংলাপ আর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সম্পর্কই ছবির আবেগের কেন্দ্র।

‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সিনেমার বার্তা কী
‘ওয়ান নাইট অনলি’ শুধু শারীরিক সম্পর্কের গল্প নয়, ওভেন আর অ্যালি শহর ঘুরতে ঘুরতে নিজেদের জীবন, স্বপ্ন, ব্যর্থতা, ভয় আর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। ওভেন বুঝতে শেখে, পরিকল্পনা করলেই জীবন সেই পথে চলে না। অ্যালি উপলব্ধি করে, নিজের স্বপ্নকে এতদিন সে নিজেই আটকে রেখেছিল। রাত যত এগোয়, ততই বদলে যেতে থাকে দুজনের সম্পর্ক।

এই ছবিতে নিউইয়র্ক শুধু পটভূমি নয়; রাতের সাবওয়ে, ব্রুকলিন ব্রিজ, ছোট পিৎজারিয়া, স্বাধীন ক্যাফে, আলো ঝলমলে রাস্তা—সব মিলিয়ে শহরটিও যেন গল্পের একটি চরিত্র হয়ে ওঠে। বড় বড় দর্শনীয় স্থানের পাশাপাশি কম পরিচিত এলাকাও দেখানো হয়েছে।  ফলে দর্শক যেন পর্যটকের চোখে নয়, শহরের একজন বাসিন্দার চোখে নিউইয়র্ককে দেখতে পান।

ছবিটি হাস্যরস দিয়ে এগোলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। রাষ্ট্র কি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন এতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? স্বাধীনতা কেবল আইনের বিষয়, নাকি মানুষের অনুভূতিরও? একটি সম্পর্ক কি শুধু শারীরিক আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, নাকি বিশ্বাস, সময় ও বন্ধুত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ? নির্মাতারা এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন না। বরং দর্শকের ভাবনার জন্য জায়গা রেখে দেন।

বিতর্কের কারণ
মুক্তির পর থেকেই ছবিটি সমালোচকদের মধ্যে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একদল মনে করেন, এমন ভয়ংকর রাজনৈতিক ধারণাকে হালকা রোমান্টিক কমেডি বানিয়ে ফেলা ঠিক হয়নি। এত বড় রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের গল্পে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের জায়গা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল।

অন্যদিকে অনেকে বলছেন, ছবিটি আসলে বাস্তব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; বরং অসম্ভব এক পরিস্থিতির মধ্যে দুই মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্প। এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়াই প্রমাণ করে, ছবির কেন্দ্রীয় ধারণা দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গাডিয়ান যেমন সিনেমাটির কড়া সমালোচনা করেছে। ‘যদি নির্মাতাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে আধুনিক রাজনৈতিক প্রতিবাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ব্যঙ্গ করা, তাহলে হয়তো সেটি কিছুটা সফল। কিন্তু পুরো ছবি দেখে বরং মনে হয়, তারা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যই দিতে চাননি। রক্ষণশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা পুঁজিবাদ—যে বিষয়গুলো নিয়ে গভীর মন্তব্য করার সুযোগ ছিল, সেগুলোর কোনোটিতেই ছবি ঢুকতে চায় না। বরং গল্প যত এগোয়, ছবির দৃষ্টিভঙ্গি ততই অদ্ভুতভাবে যৌনতাবিরোধী হয়ে ওঠে। একটি তথাকথিত “সেক্স কমেডি” হয়েও এখানে বাস্তবে কোনো যৌন দৃশ্য নেই। সেটি অবশ্য আজকের স্টুডিও ছবির ক্ষেত্রে নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, শেষ পর্যন্ত ছবিটি যেন সংযমকেই নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। স্বেচ্ছায় অপেক্ষা করা এক বিষয়; কিন্তু কারাগারের ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্র যদি সেই অপেক্ষা চাপিয়ে দেয়, সেটিকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা স্বস্তিকর নয়,’ লিখেছে দৈনিকটি।

‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘ওয়ান নাইট অনলি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

দ্য গার্ডিয়ান রিভিউয়ে আরও লিখেছে, ‘নির্মাতা নিজেই এমন একটি গল্প বেছে নিয়েছেন, যেটিকে শুধু হালকা বিনোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছবির কেন্দ্রীয় ধারণা এতটাই বড়, জটিল এবং রাজনৈতিক যে সেটিকে কেবল রোমান্টিক কমেডির যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। দর্শক স্বাভাবিকভাবেই সেই বিশ্বের আরও ব্যাখ্যা চান। সব প্রশ্ন এক পাশে সরিয়ে রাখতে পারলে অবশ্য ছবিতে উপভোগ করার মতো কিছু বিষয় রয়েছে। যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রজনন অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তখন ওভেন ও অ্যালির প্রেমের টানাপোড়েন নিছক বিনোদন হিসেবে ধরা দেয় না; বরং এটি ভবিষ্যতের এক অস্বস্তিকর সম্ভাবনার ইঙ্গিত হয়ে ওঠে। আর সেখানেই “ওয়ান নাইট অনলি”-এর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।’
‘ওয়ান নাইট অনলি’ সদ্যই মুক্তি পেয়েছে। যত দিন যাবে, সিনেমাটি নিয়ে আরও অনেক তর্কবিতর্ক হবে সন্দেহ নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ