কলকাতার এক সঙ্গীতমনস্ক পরিবারে তাঁর জন্ম। পরিবারটির জন্য সময়টি ছিল শোকের, কারন তার মাত্র মাসাধিক কাল আগেই জগন্ময়ের বাবা, যতীন্দ্র নাথ মিত্র, মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। পিতৃহারা, ভাই বোন হীন জগন্ময়, এক শোকাবহ পরিবেশে জীবনযাত্রা শুরু করেন। প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু হয় বাড়ীতেই, তারপর এন্ট্রান্স পাস করেন ১৯৩৪ সালে। তবে এর মাঝেই শুরু হয় তাঁর সঙ্গীত সাধনা। জগন্ময় মিত্রের পিতামহ বিধুভূষণ মিত্র এবং কাকা পঞ্চানন মিত্র সংগীতের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। কাকা চমত্কার হারমোনিয়াম বাজাতেন, ওস্তাদের কাছে রাগ-রাগিনীর তালিম নিতেন। সেই সময় জগন্ময় মিত্র পাশে বসে তা শুনতেন।
ছেলেবেলা থেকেই নামি গাইয়ে-বাজিয়ের তালিমের ব্যাপারটা তাই অপার কৌতূহলে খেয়াল করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
গুরুজনদের অনুপস্থিতিতে বা চোখ এড়িয়ে সে-বয়সেই ঢুকে পড়তেন নিজেদের ‘বার-বাড়ির ওস্তাদদের ঘরে’। গোপনে রাগ-রাগিণী ও তবলাবাদকের কাছ থেকে তবলার বোল শেখার সুযোগ কাজে লাগান। এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো আরো ছ-সাত বছর। গান শেখার স্বাধীন সুযোগ এলো প্রবেশিকা পাশের পর। সেও গোপনে – লুকিয়ে-চুরিয়ে। কেশব মুখোপাধ্যায়কে গুরু ধরলেন, হাতেখড়ি হলো ধ্রুপদ-খেয়াল টপ্পা-ঠুমরির। কৈশোরেই সাহিত্যিক-সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায়ের মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হন তিনি। দিলীপকুমারের আগ্রহে তাঁর কাছে গান শেখার সুযোগ মেলে। কিছুকাল পরে দিলীপকুমারকে পাকাপাকি পন্ডিচেরি চলে যেতে হয়। যাওয়ার আগে তিনি শিষ্য জগন্ময়কে বন্ধু ওস্তাদ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দিয়ে যান। জগন্ময় উত্তরকালে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তাঁর সংগীতজীবনে দিলীপকুমারের অবদানের কথা। মরমি ও তপস্বী গুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে জগন্ময়ের সংগীতজীবনের আরেক অধ্যায় শুরু হয় – একে তাঁর গান শেখার শ্রেষ্ঠ পর্বও বলা চলে। ভীষ্মদেবের কল্যাণেই তাঁর চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গে যোগ ঘটে।
গুরু কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে গান শেখার সময়েই জানুয়ারি ১৯৩৮-এ বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশন। এই সংগীত-প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অখ্যাত জগন্ময় বিস্ময় সৃষ্টি করলেন। ধ্রম্নপদ-টপ্পা-ঠুমরি-বাউল-কীর্তন-রাগপ্রধান গানে প্রথম হলেন – তবে কিছুটা আফসোসের সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন : ‘যে গানে আমার প্রচার বা প্রতিষ্ঠা…, সেই আধুনিক বাংলা গানে হলাম তৃতীয়।’
এইচএমভির রিহার্সেল রুমে নজরুলের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্তটি জগন্ময় মিত্রর জন্যে ছিল শিহরিত হওয়ার মতো ঘটনা। নজরুলের মতো অমন বিরাট সংগীত-ব্যক্তিত্বের সামনে জগন্ময়ের কুঁকড়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। কিন্তু নজরুল তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পরিবেশ হালকা করে দিয়েছিলেন প্রথম সাক্ষাতেই ‘তুই’ সম্বোধন করে। নজরুল জানতে চাইলেন কী গান গাইতে চান এই তরুণ শিল্পী। জবাবে জগন্ময় অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে জানালেন, তিনি নিজেই দু-একটা গান লিখে তাতে সুর-যোজনা করেছেন। নজরুল শোনাতে বললে জগন্ময় গাইলেন : ‘যদি বাসনা মনে/ দিবে দহন জ্বালা/ তবে মনের কোণে/ কেন বাসিলে ভালো।’ নজরুল সুরের প্রশংসা করে স্মরণ করিয়ে দিলেন কমার্শিয়াল গানের ধরন-ধারণের কথা। তারপর এই সুরের ওপরেই কথা বসিয়ে সেই আসরেই লিখে দিলেন তাঁর এই গানটি : ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে/ বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে।’ জগন্ময় এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে : ‘গানটিকে সুরে বসিয়ে নিয়ে যখন কাজীদাকে গেয়ে শোনালাম সে যে কী হাসি হাসলেন তা লিখে আপনাদের বোঝাতে পারব না। কাজীদার হা হা করে দিলখোলা হাসি দেখে মনে হলো যেন আমরা পৃথিবী জয় করেছি। কাজীদার লেখা গানটির জন্যই যে আমার সুরের মর্যাদা বাড়ল তা একবারও উল্লেখ না করে কেবলই বলতে লাগলেন, ‘তোর সুরটা বড়ো সুন্দর – তোর সুরটা বড়ো সুন্দর।’ কাজীদা যে কত উদার, কত মহৎ তা কি লিখে বোঝানো সম্ভব?’
বাংলা আধুনিক ও নজরুল গীতির পাশাপাশি, ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা সহ সঙ্গীতের প্রায় সব প্রচলিত ধারায় তাঁর ছিল স্বচ্ছন্দ পদচারনা। ১৯৩৮ সালেই জগন্ময় মিত্র এইচএমভিতে গান রেকর্ড করার সুযোগ পান ও সেই সাথে শুরু হয় তাঁর জয়যাত্রা। প্রণব রায়ের কথায় কমল দাসগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ এবং ‘তোমার মতন কত না নয়ন’ গান দুটি তাঁকে প্রথম খ্যাতি এনে দেয়। এইচএমভিতে-ই ‘যদি বাসনা মনে দিবে দহন জ্বালা’ গানটি জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে শুনে কাজী নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়ে খুব তারিফ করেছিলেন। সে থেকেই কাজী দা’র সাথে জগন্ময় মিত্রের আজীবনের হৃদ্যতা শুরু। অনেক নজরুল গীতি রেকর্ড করার পাশাপাশি, ১৯৪১ এ কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীতও গান জগন্ময় মিত্র। ১৯৪২ এ, জগন্ময় রেকর্ড করেন দুটি অসামান্য কাব্য গীতি – ‘সাতটি বছর আগে’ ও ‘সাতটি বছর পরে’। গান দুটি, পরবর্তীকালে গীত ‘চিঠি – তুমি আজ কত দূরে’ গানটির সাথে গড়ে তোলে এক অবিস্মরণীয় মরমী ট্রিলজি। এরপর ১৯৪০, ১৯৫০ এর দশক জুড়ে ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল’, ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’, ‘ভুলি নাই ভুলি নাই’, ‘মেনেছি গো হার’, ‘আমি স্বপন দেখেছি’, ‘স্বপন সুরভী মাখা’, ‘গভীর নিশিথে ঘুম’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘হৃদয় যেন কাহারে চেয়েছিল’, ‘তোমারে তো আজও ভুলি নাই’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, ‘শাওনও রাতে যদি’ এমন অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গান গেয়ে জগন্ময় মিত্র শ্রোতাদের মনমুকুরে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেন।
অসংখ্য কালজয়ী বাংলা গানের শিল্পী ছিলেন তিনি, তবে ১৯৪৮ সালে রেকর্ড করা “চিঠি – তুমি আজ কত দূরে” গানটি তাঁকে অমরত্ব এনে দেয়। লক্ষ কোটি শ্রোতা, রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে গানটিকে যেন নিজেরই প্রেমপত্র হিসেবে গ্রহন করে নেন। ফলে বাংলা আধুনিক / কাব্য সঙ্গীতের ইতিহাসে এটিই সর্বাধিক শ্রুত ও বিক্রীত একক সঙ্গীত হিসেবে অদ্যাবধি পরিগনিত (এইচ এম ভি’র হিসাবে, ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে ক্যাসেট যুগ পর্যন্ত গানটির ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে)।
১৯৩৮ সালে এলাহাবাদের অল ইন্ডিয়া মিউজিক কম্পিটিশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ঘটে। এই প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাপনায় ছিল প্রয়াগ সংগীত সম্মেলন। জগন্ময় খেয়ালে অংশ নিয়ে প্রথম হন। এই প্রতিযোগিতায় প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ। সংগীত-সমঝদার মানুষের মুখে আর খবরের কাগজে তাঁর প্রশংসা প্রকাশ পায়। কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক তাঁর নাম ছাপা হয় ‘জগমোহন মিত্র’। শেষ পর্যন্ত ‘জগমোহন’ নামটিই পাকাপাকি বহাল থাকে। উত্তরকালে যখন তিনি বাংলা মুলুক ছেড়ে বোম্বাইয়ে পাড়ি জমান, তখন সেখানে হিন্দি গজল-গীতের গায়ক হিসেবে ‘জগমোহন’ নামটিই তিনি গ্রহণ করেন।
১৯৩৮ সালে সংগীতনগরী লখনউয়ে জগন্ময় প্রথমে ডি. সি. দত্ত ও পরে তাঁরই কল্যাণে প্রখ্যাত ওস্তাদ শম্ভু মহারাজের কাছে ঠুমরি ও খেয়ালের তালিম নেন। এখানেই কুন্দনলাল সায়গলের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে সায়গল যখন কলকাতায় আসেন, ফিল্ম ও গানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তখন দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে নিবিড় সখ্য-সৌহার্দ্য। লখনউ থেকে কলকাতায় ফিরে এসে জগন্ময়ের সংগীতজীবনের এক নতুন পর্ব শুরু হয় গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে।
সংগীতে জগন্ময়ের আত্মপ্রকাশ রেডিয়োতেই। কথাপ্রসঙ্গে বলেছেন : ‘রেডিয়োর ওপর আমার বড়ো দুর্বলতা। সেই যে জীবনের শুরুতে রেডিয়োর সঙ্গে (১৯৩৬-৩৭) যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল তা আজও নিরবচ্ছিন্ন। তাই রেডিয়োকে ভালবেসে ফেলেছি।’ দিন দিন এই ‘ভালবাসা’ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো কলকাতা কেন্দ্রে মাত্র উনিশ বছর বয়সে গান গাওয়ার সুযোগ পান। সংগীত পরিবেশন শুরু হয় স্কুল ব্রডকাস্ট প্রোগ্রামে। প্রথম প্রথম বিনা পারিশ্রমিকে, পরে প্রতি প্রোগ্রামে পাঁচ টাকা করে শিল্পী-সম্মানী নির্ধারিত হয়। একসময় রেডিয়োতে তাঁর গুরুত্ব ও উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। রেডিয়োর শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান ও যোগ্য সম্মানীর জন্যে জগন্ময় সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন এবং এ নিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন কলকাতা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীসংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে।
গুরু ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কল্যাণে হিন্দি ছবি গরিবিতে প্রথম প্লে-ব্যাকের সুযোগ মেলে। এ-প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণায় জগন্ময় বলেছেন : ‘এই সময়ে ভীষ্মবাবু ফিল্ম করপোরেশন অব ইন্ডিয়া (Film Corporation of India) নামে এক ফিল্ম কোম্পানির সংগীত-পরিচালকের পদ গ্রহণ করলেন এবং সহকারী হিসেবে নিলেন শ্রীশচীন দেববর্মনকে। আমাকে ডাক দিলেন গান গাইবার জন্য। হিন্দি ছবি। দু-তিনটি গান আমি গাইলাম। কোনোটা ডুয়েট, কোনোটা কোরাস। ফিল্মের প্লে-ব্যাক বা নেপথ্য গানের হাতেখড়ি হলো আমার ওস্তাদের হাতে। যতদূর মনে পড়ে প্রথম প্লে-ব্যাক গান গেয়েছিলাম হিন্দি ছবি গরিবিতে, যার সুরকার ছিলেন স্বয়ং ভীষ্মবাবু। গানটি হলো – ‘চরখা চলকে কাম বানায়ে/ চরখা আয়ে গরিবি যায়ে \’ কাজ না থাকলেও ফি-দিনই স্টুডিয়োতে আসতে হতো। আর এই অবসর সময়েই গুরু ভীষ্মদেব শচীন দেববর্মন ও জগন্ময় মিত্রকে তালিম দিতেন। জগন্ময় স্মরণ করেছেন : ‘সত্যি কথা বলতে কি, বেশিরভাগ তালিম আমার স্টুডিয়োতেই হয়েছিল’ এবং এতে শিক্ষানবিশি-পর্বে তাঁর ও শচীন দেববর্মন দুজনেরই খুব লাভ হয়েছিল।
পাপের পথে – এই বাংলা ছায়াছবিতে জগন্ময়ের প্রথম প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে আবির্ভাব। বাংলা ফিল্মে তাঁর অভিষেক হয়েছিল সুরসাগর হিমাংশু দত্তের আনুকূল্যে। দ্বৈতকণ্ঠের এই গানটির মুখটা ছিল এইরকম : ‘মধুকর স্বপনে জাগি/ কি বাণী কয়, নয়, নয়, নয়।’ বাংলা ফিল্মে জগন্ময়ের প্লে-ব্যাকের বিশদ বিবরণ আজ আর সুলভ নয়, তিনি নিজেও এ-পর্বের কথা সেরেছেন আভাসেই, যেমন : ‘বহু পরিচালক ও সংগীত-নির্দেশকের ছবিতে প্লে-ব্যাক (নেপথ্য সংগীত) গান দিলাম। পরিচালকদের মধ্যে শ্রীপ্রমথেশ বড়ুয়া, শ্রীদেবকী বোস, শ্রীশৈলজানন্দ, শ্রীনীরেন লাহিড়ী, শ্রীপ্রেমেন্দ্র মিত্র ইত্যাদি। আর যেসব সংগীত-নির্দেশকের সুরে গান গেয়েছি তাঁদের কয়েকজন হলেন শ্রীকমল দাশগুপ্ত, শ্রীসুবল দাশগুপ্ত, শ্রীগিরীন চক্রবর্তী, শ্রীহিমাংশু দত্ত সুরসাগর, শ্রীঅনিল বাগচী, শ্রীদুর্গা সেন, শ্রীঅনুপম ঘটক ও শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র দে। দ্বৈত-সংগীত অবশ্য অনেকেরই সঙ্গে গেয়েছি, তার মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য শ্রীমতী কানন দেবীর নাম। জগন্ময় মিত্র ২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৮৫ বছর বয়সে জগন্ময় মিত্র কলকাতায় পরলোকগমন করেন। সঙ্গীত জগতে তাঁর মৃত্যু গভীর শোকের ছায়া এনে দিয়েছিল ।