ভাষা মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। মানুষ তার আনন্দ, বেদনা, স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রতিবাদের কথা ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে। কিন্তু পৃথিবীর সব মানুষ একই ভাষায় কথা বলে না। এই বৈচিত্র্য যেমন মানবসভ্যতার সৌন্দর্য, তেমনি যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় দেয়ালও। সেই দেয়াল ভেঙে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে যে সেতু, তার নাম অনুবাদ।
আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। অনুবাদকদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
একজন অনুবাদক আসলে শুধু শব্দের কারিগর নন। তিনি এক ভাষার ভাবকে অন্য ভাষার মানুষের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেন। একটি কবিতার বিষাদ, একটি উপন্যাসের চরিত্র, একটি ইতিহাসের রক্তক্ষরণ, একটি দর্শনের চিন্তা কিংবা একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জ্ঞান সবকিছুকে অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেন তিনি। তাই অনুবাদকে শুধু ভাষান্তর বললে এর প্রকৃত গুরুত্বকে ছোট করা হয়।
একটি ভালো অনুবাদ কখনোই শব্দে শব্দে বন্দি থাকে না। সেখানে প্রয়োজন ভাবের বিশ্বস্ততা, ভাষার সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতা। মূল লেখকের বক্তব্যকে বিকৃত না করে নতুন ভাষায় এমনভাবে প্রকাশ করতে হয়, যেন পাঠক মনে করেন রচনাটি যেন তার নিজের ভাষাতেই লেখা।
আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সেন্ট জেরোমের নাম। খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদ সেন্ট জেরোম ছিলেন প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদক। বাইবেলের বিভিন্ন অংশ অনুবাদ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি গ্রিক ও হিব্রু ভাষার ধর্মীয় গ্রন্থকে লাতিন ভাষায় রূপান্তরের কাজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন।
সেন্ট জেরোমের মৃত্যু হয় ৩০ সেপ্টেম্বর বেথলেহেমে। অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক বা প্রতীকী অভিভাবক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করা হয়। তাঁর মৃত্যুদিনকে স্মরণ করেই ৩০ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ দিবসটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং ২০১৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
কিন্তু অনুবাদের ইতিহাস সেন্ট জেরোমের সময় থেকে শুরু হয়নি। সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে অনুবাদের ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যখন একটি জাতি অন্য জাতির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, বাণিজ্য করেছে, যুদ্ধ করেছে কিংবা জ্ঞান বিনিময় করেছে তখনই অনুবাদের প্রয়োজন হয়েছে।
বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালেও অনুবাদের শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা বাংলায় বসে শেক্সপিয়র পড়ি, টলস্টয় পড়ি, দস্তয়েভস্কি পড়ি, পাবলো নেরুদার কবিতা পড়ি, মার্কেসের জাদুবাস্তবতার জগতে প্রবেশ করি। তাঁদের মাতৃভাষা আমাদের ভাষা নয়। তবু তাঁরা আমাদের আপন হয়ে ওঠেন অনুবাদের মাধ্যমে।
একইভাবে বাংলা সাহিত্যও অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে পৌঁছেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য বাংলা ভাষার সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যের অংশ হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের বাণী অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম মাধ্যমও অনুবাদ।
বাংলাদেশের জন্য অনুবাদের গুরুত্ব আরও গভীর। আমাদের ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয়; এটি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, শরণার্থীদের দুর্ভোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে নির্ভুল অনুবাদ প্রয়োজন।
একইভাবে বাংলাদেশের সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, নদী, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতেও অনুবাদ অপরিহার্য।
গণমাধ্যমেও অনুবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। আন্তর্জাতিক সংবাদ, কূটনৈতিক বক্তব্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা তথ্য প্রতিদিন অনুবাদের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে। একটি শব্দের ভুল অনুবাদ কখনো কখনো একটি বক্তব্যের অর্থই বদলে দিতে পারে। তাই সাংবাদিকতা ও অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাষাজ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিষয়জ্ঞান, নির্ভুলতা ও দায়িত্ববোধ।
আজকের পৃথিবীতে অনুবাদের সামনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এখন কয়েক সেকেন্ডেই একটি দীর্ঘ লেখা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা সম্ভব। এতে অনুবাদের কাজ দ্রুত হয়েছে, সহজ হয়েছে। কিন্তু ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। একটি প্রবাদ, একটি রসিকতা, একটি ব্যঙ্গ, একটি আঞ্চলিক শব্দ কিংবা একটি সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতের ভেতরে যে গভীর অর্থ থাকে, তা সব সময় যান্ত্রিকভাবে ধরা সম্ভব হয় না।
তাই প্রযুক্তি অনুবাদকের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার পাশাপাশি সহযোগীও হতে পারে। এআই হয়তো প্রথম খসড়া তৈরি করবে, কিন্তু সেই অনুবাদকে মানবিক, প্রাঞ্জল, নির্ভুল ও সাংস্কৃতিকভাবে যথাযথ করে তোলার দায়িত্ব দক্ষ মানুষেরই থাকবে এমন বাস্তবতা সামনে রেখেই ভবিষ্যতের অনুবাদচর্চা এগোতে পারে।
দুঃখের বিষয়, আমাদের সমাজে অনুবাদকদের শ্রম অনেক সময় যথাযথ মর্যাদা পায় না। একটি বই প্রকাশের পর লেখকের নাম আলোচনায় থাকে, কিন্তু অনুবাদকের দীর্ঘ শ্রম অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ একজন অনুবাদককে একটি রচনার প্রতিটি বাক্য, শব্দ, উপমা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে ভাবতে হয়। কখনো একটি শব্দের সঠিক অর্থ খুঁজতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা করতে হয়।
তাই অনুবাদকের কাজকে ‘সহজ ভাষান্তর’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি সৃজনশীল, গবেষণাধর্মী ও দায়িত্বশীল পেশা।
আমাদের দেশে অনুবাদচর্চাকে আরও শক্তিশালী করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুবাদবিদ্যার গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বাংলা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য, গবেষণা, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের বই অনুবাদের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুবাদকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কারণ অনুবাদ শুধু ভাষার সীমানা ভাঙে না; এটি মানুষের চিন্তার সীমানাও ভাঙে।
একজন মানুষ যখন অন্য ভাষার একটি কবিতা পড়ে নিজের জীবনের অনুভূতি খুঁজে পান, তখন সেখানে শুধু ভাষার আদান-প্রদান ঘটে না দুই অচেনা মানুষের হৃদয়ের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন বাঙালি যখন রুশ সাহিত্য পড়ে রাশিয়ার মানুষের দুঃখ অনুভব করেন, কিংবা একজন বিদেশি যখন অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার কবিতা পড়ে বাঙালির স্বপ্ন ও বেদনা উপলব্ধি করেন—সেখানেই অনুবাদের প্রকৃত সার্থকতা।
অনুবাদ তাই ভাষার সেতু, সংস্কৃতির সেতু, জ্ঞানের সেতু এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের সেতু।
৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসে সেইসব নেপথ্য কারিগরের কথা স্মরণ করি, যাঁরা নিজেদের ভাষার পরিচয়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে অন্য ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছে দেন পৃথিবীর অসংখ্য গল্প, ইতিহাস, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের কথা।
ভাষা আমাদের আলাদা করে; অনুবাদ আমাদের আবার এক করে।
এই এক করে দেওয়ার মহৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত সকল অনুবাদককে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।