বৃদ্ধকে রাস্তায় ফেলে গেল স্বজনরা, উদ্ধার করে দায়িত্ব নিলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি আশ্রয় খোঁজেন নিজের সন্তান-স্বজনের কাছে। কিন্তু টাঙ্গাইলের এক শতবর্ষী বৃদ্ধের ভাগ্যে জুটেছে তার উলটো চিত্র। যে মানুষটি সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের বড় করেছেন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে, চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত তাকেই ফেলে রাখা হলো রাস্তার পাশে। অসহায় সেই বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ালেন টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল শহরের বৈল্লা সেতুর পাশে কান্নারত অবস্থায় উদ্ধার হন বৃদ্ধ মফিজ উদ্দিন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন এই বৃদ্ধ গত কয়েক বছর ধরে একা চলাফেরা করতে পারেন না। বয়সের ভার ও শারীরিক দুর্বলতায় দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তার জীবন হয়ে উঠে নিঃসঙ্গ। এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আর ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন। জীবনের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দুই ছেলের নামে লিখে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকেই পরিবারে তার অবস্থান ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেশীরা জানান, তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতেই বসবাস করতেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সেখানে নাতনি ও তার স্বামী থাকতেন। কিন্তু তারা বৃদ্ধ দাদার দেখাশোনা করতে চাননি। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান। দীর্ঘ সময় সেখানে বসে কান্না করছিলেন তিনি। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তার পরিচয় শনাক্ত করেন।

ততক্ষণে খবরটি পৌঁছে যায় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কাছে। বিষয়টি জানার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টাঙ্গাইল সদর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিরাপদে তার ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ শুরু করে পুলিশ। ইতোমধ্যে নাতনিকে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

শুধু উদ্ধারেই থেমে থাকেননি প্রতিমন্ত্রী। বৃদ্ধের চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। দ্রুত বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তার থাকার জন্য আলাদা কক্ষ ভাড়া নেওয়া এবং সেই খরচও নিয়মিত বহন করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রথমদিকে বাবার দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর ছোট মেয়ে রিনা বেগম বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

রিনা বেগম বলেন, পাশের বাড়ির লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি, আমার বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রতিমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন থেকে বাবার দায়িত্ব আমিই পালন করব।

টাঙ্গাইল সদর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। তিনি বর্তমানে তার ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেছেন।

প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক। বাবা-মা আমাদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যতদিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে যারা তাকে এভাবে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ