হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক করেছিলেন মা, ছয় মাস কথা বলেননি, তিনিই এখন ১০০ কোটি বাজেটের ছবির নায়িকা

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান সময়ের আলোচিত তেলেগু অভিনেত্রী ভাগ্যশ্রী বোর্সে জানিয়েছেন, অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিবারের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। এমনকি মা ছয় মাস তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি, হোয়াটসঅ্যাপেও ব্লক করে দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি কলেজশিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘অনেস্ট টাউন হল’ অনুষ্ঠানে নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন ‘লেনিন’ ছবির এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, পরিবারের সবাই শুরুতে তাঁর অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।

ভাগ্যশ্রী বলেন, ‘আমি প্রথমে মাকে ফোন করেছিলাম। তিনি না বললেন। এরপর বাবাকে ফোন করলাম, তিনিও বললেন, “তোমার মা না বলেছে।” ভাবলাম, অন্তত বোন পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সে–ও না বলল। পরিবারের সবাই আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিল।’

তবে ভাগ্যশ্রী মনে করেন, পরিবারের এই আপত্তি ভালোবাসা থেকেই এসেছিল। তাঁর ভাষায়, ‘মা–বাবা ভয় পেয়েছিলেন। সিনেমার বাইরের মানুষ হিসেবে তাঁদের মনে হয়েছিল, এই জগৎ নিরাপদ নয়। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, তাঁদের ছোট মেয়ে বাইরে গিয়ে নানা ধরনের খারাপ মানুষের মুখোমুখি হতে পারে। এখন বুঝি, মা–বাবা হলে এমন উদ্বেগ স্বাভাবিক।’

সব বাধা সত্ত্বেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন ভাগ্যশ্রী। তিনি বলেন, ‘আমার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল—৮০ বছর বয়সে গিয়ে যেন বলতে না হয়, “যদি চেষ্টা করতাম!” আমি জীবনে কোনো আক্ষেপ রাখতে চাইনি। যা করতে ইচ্ছা হয়, সেটা চেষ্টা করে দেখা উচিত।’

ভাগ্যশ্রী বোর্সে। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
ভাগ্যশ্রী বোর্সে। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

এরপর ভাগ্যশ্রী গোপনে অডিশন দেওয়া শুরু করেন। তখনই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ‘মা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ব্লক করে দিয়েছিলেন। পুরো ছয় মাস তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি। এখন হয়তো হাসিমুখে বলছি, কিন্তু তখন সময়টা খুব কঠিন ছিল,’ বলেন ভাগ্যশ্রী। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন তাঁর কাজই পরিবারের মন জয় করবে।

‘আমি শুধু চাইতাম, একদিন মা-বাবা আমার জন্য গর্ব অনুভব করুন। মানুষ যেন তাঁদের জিজ্ঞেস করে, “আপনার মেয়ে এখন কী করছে?”—এটা নয়; বরং বলে, “আপনার মেয়ে অসাধারণ কাজ করেছে।” সেই দিনটাই আমি দেখতে চেয়েছিলাম,’ বলেন অভিনেত্রী।

আলাপচারিতায় আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়েও কথা বলেন অভিনেত্রী। ছোটবেলার একটি ঘটনা তাঁর জীবনদর্শন বদলে দিয়েছিল বলে জানান তিনি। ভাগ্যশ্রী স্মরণ করেন, মুম্বাইয়ের লিংকিং রোডে একবার ২০০ রুপির একটি স্যান্ডেল কিনে দিতে বাবাকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বাবা সেটি কিনে দেননি।

‘সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, মাত্র ২০০ রুপির স্যান্ডেলও কেনা গেল না! কিন্তু ওই ঘটনাই আমাকে দুটি শিক্ষা দিয়েছে—প্রথমত, দরাদরি করতে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের প্রয়োজনের জন্য কারও কাছে টাকা চাইব না,’ বলেন ভাগ্যশ্রী।
বিশেষ করে তরুণীদের উদ্দেশে ভাগ্যশ্রীর বার্তা, প্রত্যেক নারীর নিজের আয়, নিজের ব্যাংক হিসাব এবং সম্ভব হলে নিজের একটি বাড়ি থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘নিজের পছন্দের জিনিস নিজেই কিনতে পারার ক্ষমতা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে যাঁর সঙ্গেই হোক, একজন নারীর নিজের ব্যাংক হিসাব ও নিজের একটি বাড়ি থাকা উচিত। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, স্বাধীনতার অনুভূতি আসে।’

ভাগ্যশ্রী বোর্সে। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
ভাগ্যশ্রী বোর্সে। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রথম বড় পারিশ্রমিক কীভাবে খরচ করেছিলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ভাগ্যশ্রী জানান, নিজের জন্য নয়, সবার আগে মা–বাবার জন্যই কিছু কিনেছিলেন। ‘নিজের জন্য খরচ করতে গেলে আমি অনেক ভাবি। কিন্তু মা-বাবার জন্য হলে যত দরকার, ততই খরচ করতে পারি। আমার মনে হয়, অনেক মেয়েই এমন হয়—নিজেদের চেয়ে পরিবারের কথা আগে ভাবে,’ বলেন তিনি।

কঠিন শৈশব পেরিয়ে
একই অনুষ্ঠানে ভাগ্যশ্রী কথা বলেন নিজের কঠিন শৈশব নিয়েও। তিনি বলেন, ‘আমি জন্মানোর পর থেকেই জীবনের অন্য রকম একটি দিক দেখেছি। আমার পরিবার নিম্নমধ্যবিত্ত ছিল। স্থিতিশীল জীবন বলতে কিছু দেখিনি। সব সময় দেখেছি, মা-বাবা আমাদের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু নানা বাধার মুখে পড়ছেন। তবু তাঁরা কখনো হাল ছাড়েননি। আমরা সত্যিই শূন্য থেকে শুরু করেছি।’
শৈশবে অর্থের গুরুত্ব বোঝেননি ভাগ্যশ্রী। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন, সংসার চালাতে তাঁর মা–বাবাকে কতটা হিসাব করে চলতে হতো।

সবচেয়ে বেশি মনে দাগ কেটেছে বাবার একটি ঘটনা। ভাগ্যশ্রী বলেন, ‘আমি নিজের চোখে দেখেছি, বাবা একজনের কাছে বলছেন, “দয়া করে আমাকে একটা কাজ দিন। আমার দুটি মেয়ে আছে।” ছোট্ট একটি শিশুর কাছে নিজের বাবাকে এভাবে অনুরোধ করতে দেখা খুব কষ্টের। তখনই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, জীবনে এমন কিছু করব, যাতে বাবাকে আর কখনো এভাবে কারও কাছে হাত পাততে না হয়। আজ আমার সব স্বপ্ন আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রেই আছেন আমার মা-বাবা।’

ভাগ্যশ্রী সম্পর্কে
মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে জন্ম নেওয়া ভাগ্যশ্রীর শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে নাইজেরিয়ার লাগোসে। প্রায় সাত বছর সেখানে পড়াশোনা করার পর পরিবার নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। মুম্বাইয়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি মডেলিং শুরু করেন তিনি।

অভিনয়ে ভাগ্যশ্রীর যাত্রা শুরু হয় ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে। ‘ইয়ারিয়াঁ ২’ ও ‘চান্দু চ্যাম্পিয়ন’ ছবিতে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতির পর ২০২৪ সালে রবি তেজার বিপরীতে ‘মিস্টার বচ্চন’ ছবিতে প্রথমবার নায়িকা হিসেবে নজর কেড়েছিলেন ভাগ্যশ্রী।

এরপর বিজয় দেবরাকোন্ডার ‘কিংডম’, দুলকার সালমানের ‘কান্থা’ এবং রাম পোথিনেনির ‘আন্ধ্র কিং তালুকা’ ছবিতেও অভিনয় করেন ভাগ্যশ্রী। সামনে শিবকার্তিকেয়নের বিপরীতে তামিল ছবি ‘সেয়ন’-এ দেখা যাবে তাঁকে। সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ‘লেনিন’ ছবিতে অখিল আক্কিনেনির বিপরীতে অভিনয় করে নতুন করে দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ১০ জুলাই মুক্তি পাওয়া ১০০ কোটি রুপি বাজেটের সিনেমাটি বক্স অফিসেও সাফল্য পাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ