হামের ভয়াবহতা বাড়ছেই, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ১ হাজার ৪০১ জনের

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ১ হাজার ২৯৭ জন। সব মিলিয়ে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০১ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৪২ জন রোগী। সংক্রমণের এই চিত্র জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়। বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ সময়ে দেশের আটটি বিভাগেই হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৫৮৭ জন, চট্টগ্রামে ২৯২ জন, সিলেটে ১৩৬ জন, বরিশালে ১২৩ জন, খুলনায় ৭৩ জন, ময়মনসিংহে ৬৯ জন, রাজশাহীতে ৪০ জন এবং রংপুরে ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার ৬৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪২ জন। একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৫১ জনে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৫৭ জনের।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই পরিসংখ্যান সংক্রমণের বিস্তৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিলেও জানুয়ারি থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট মৃত্যুর হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে হাম এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ও সন্দেহজনক মৃত্যুর হিসাব তাই পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, তীব্র পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়, যা রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার আশঙ্কা বেশি।
এ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং হাম সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখাও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। সংক্রমণের প্রকৃত বিস্তার, মৃত্যুর কারণ নিরূপণ এবং রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে আর কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা বহন করতে না হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ