সৌদি–হুথি সংঘাত: নতুন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে রিয়াদ এমন তথ্যও উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পড়তে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে হুথিদের নতুন হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। একই দিন সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় দুজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। নিহতদের মধ্যে একজন সৌদি নাগরিক ও অন্যজন ভারতীয় নাগরিক বলে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরে স্বাভাবিক হয়।

বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু

সাম্প্রতিক সংঘাতের অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামো সামনে চলে এসেছে। রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর ধাহরান কার্যালয় এলাকায় হামলার পর হুথিরা দেশটির বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় আরও হামলা চালানোর হুমকি দেয়।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাব হিসেবেই তারা এসব আক্রমণ চালাচ্ছে। তবে বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকলে প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এর আগে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও সৌদি আরবের রিয়াদ ও আভা বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় হতাহতের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এসব হামলার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ফলে হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি

রয়টার্সের ২ অক্টোবরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল এবং লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব একটি সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। সম্ভাব্য অভিযানে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে সামনে রেখে সৌদি বিমান হামলার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অভিযানের সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকা এবং ইয়েমেনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রের কথা উঠে আসে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়া আর অভিযান বাস্তবে শুরু হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযানের সময়সূচি, পরিধি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া একে নিশ্চিত সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও তা স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে রূপ নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও হামলা ও পাল্টা হামলা বাড়ায় সেই স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উদ্বেগ

সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর দেশটিতে দায়িত্ব পালনরত কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

এদিকে, সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে মিসর। রয়টার্সের ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পক্ষ থেকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। তবে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, পাইপলাইন ও রপ্তানি টার্মিনাল হামলার ঝুঁকিতে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ২২ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন হামলার খবরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। তবে এসব প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, তেল সরবরাহে প্রকৃত বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন, বিমা ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছানোর সময়ও বেড়ে যেতে পারে।

শান্তি আলোচনা কি আবারও অনিশ্চিত?

সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতের মূল সংকট কেবল সীমান্ত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। ইয়েমেনের রাজনৈতিক ক্ষমতা, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক প্রভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা সবকিছুই এ সংঘাতের সঙ্গে জড়িত। ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্কও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে হুথিদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ সরাসরি ইরানের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করলে হুথিদের পাল্টা হামলা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সংঘাতে আরও আঞ্চলিক শক্তি যুক্ত হলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। তবে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যাবে, নাকি নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি হবে তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ