সামাজিক মাধ্যমের পরিচয়, স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন-ঘর ছাড়ছে বাংলাদেশের কিশোরীরা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

নিজেদের আয়ে চলা, পরিবারের শাসন থেকে মুক্তি কিংবা অনলাইনে পরিচিত তরুণের সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর আশায় বাড়ি ছাড়ছে অনেক কিশোরী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের।

শফিকুল আলম সেলিম

পরিবারের শাসন, পড়াশোনার চাপ, অভিমান, পারিবারিক অশান্তি কিংবা স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন কারণে বাড়ি ছাড়ছে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে পরিচয়, বন্ধুত্ব এবং একসঙ্গে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা, কুষ্টিয়া ও বান্দরবানের লামাসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক কিশোরী বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাদের উদ্ধার করেছে। কয়েকটি ঘটনায় এখনো নিখোঁজ কিশোরীদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এসব ঘটনায় কিশোরীদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মনোবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরের আবেগ, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব এবং অনলাইন যোগাযোগের ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করলে শিশু-কিশোরীরা বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, “পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কিশোর-কিশোরীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছেন। অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, পরিবারের বাবা বা মা এক ধরনের অসুস্থ জীবন যাপন করছেন। তারাও হয়তো অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে গেছেন। এর প্রভাব পড়ছে সন্তানদের ওপর।”

সম্প্রতি কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া চার কিশোরীকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে কয়েকজন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। তাদের সঙ্গে ছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি শিশুও। গত সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও তারা বিদ্যালয়ে যায়নি, বাড়িতেও ফেরেনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে বিভিন্ন তরুণের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় গিয়ে উপার্জন করা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করা এবং পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা। এ জন্য তারা বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন নিয়ে বের হয়েছিল।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “তারা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। টিকটকে ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তাদের পরিচিতি ও যোগাযোগ তৈরি হয়।”

তিনি জানান, কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তাদের পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠলেও তরুণদের প্রকৃত ঠিকানা সম্পর্কে তারা জানত না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ধারণা ও কল্পনায় বিভ্রান্ত হয়ে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই পরিবারের দুই বোনের মধ্যে বড় বোন বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে ছোট বোন বিষয়টি বুঝতে পারে। তাকে সঙ্গে না নিলে বাবা-মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল সে। পরে তাকেও সঙ্গে নেওয়া হয়।

চার কিশোরীকে উদ্ধারের পর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘটনা দেখিয়েছে, অল্প বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মানুষের প্রতি আস্থা তৈরি হলে শিশুরা নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা ছাড়াই বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী থেকে নিখোঁজ হওয়া তিন কিশোরীকে সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বয়স ১৩, ১৪ ও ১৭ বছর। তারা একই পাড়ার বাসিন্দা এবং পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ১৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুই কিশোরী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ১৭ বছর বয়সী কিশোরী চকরিয়ার মানিকপুর এলাকার একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

গত ১১ অক্টোবর বিদ্যালয় থেকে নিবন্ধন কার্ড আনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাদের খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার।

উদ্ধারের পর ১৭ বছর বয়সী কিশোরী জানিয়েছে, নিজের আয়ে চলার জন্য বাড়ি ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে গিয়েছিল তারা। সেখানে গৃহকর্মীর কাজ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় ঘোরাফেরার সময় এক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। বাড়ি ছেড়ে আসা এবং কাজ করার ইচ্ছার কথা জানালে ওই ব্যক্তি তাদের খুলশি এলাকার পরিচিত ব্যক্তিদের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে দুই কিশোরী কাজ পায়।

পরে এক কিশোরী তার মাকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরিবার লামা থানার পুলিশকে খবর দিলে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়।

ওই কিশোরীর মা জানান, মেয়ের চিন্তায় তিন দিন-চার রাত তার নির্ঘুম কেটেছে। পড়াশোনা নিয়ে মেয়েকে শাসন করেছিলেন তিনি। সেই শাসনের কারণেই মেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় বলে জানিয়েছে। বাড়ি ফিরে মেয়ে ভুল স্বীকার করেছে এবং আর এমন করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ওই মা বলেন, “আমরা তাকে আর অতিরিক্ত শাসন করব না।”

ঘটনাটি কিশোরীদের বাড়ি ছাড়ার পেছনে পারিবারিক শাসন ও স্বাধীনভাবে উপার্জনের আকাঙ্ক্ষার মতো কারণের উপস্থিতি তুলে ধরে। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।

কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে নিখোঁজ হওয়া চার কিশোরীকে ছয় দিন পর উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের বয়স ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের মধ্যে কুষ্টিয়ার তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জের একজন ছিল।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে পরিচয়ের সূত্র ধরে কুষ্টিয়ার তিন কিশোরীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এক কিশোরীর যোগাযোগ তৈরি হয়। স্বাধীনভাবে বাঁচা এবং একসঙ্গে থাকার উদ্দেশ্যে তারা ঢাকায় চলে আসে। পরে সাভারের হেমায়েতপুরে একটি বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করে।

প্রযুক্তির সহায়তায় ১৩ অক্টোবর তাদের উদ্ধার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।

এ ঘটনাতেও দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া বন্ধুত্ব কিশোরীদের বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। তবে অনলাইনে পরিচিত ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়, বয়স, উদ্দেশ্য ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই তাদের ওপর নির্ভর করা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া তিন কিশোরীকে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এক কিশোরী তার বান্ধবী ও বান্ধবীর ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, আগারগাঁও এলাকার একটি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে তার এক বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরিবার থেকে বাধা দেওয়া হতো। একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থী তার মাকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে। এরপর নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও কাপড়চোপড় নিয়ে ছোট বোনকে সঙ্গে করে বাড়ি ছাড়ে।

পরে তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠে। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

এ ধরনের ঘটনা পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, বন্ধুত্বের বিষয়ে মতবিরোধ এবং কিশোর-কিশোরীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে তৈরি হওয়া সংঘাতের দিকটি সামনে আনে। সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের কথা শোনা এবং সমস্যার সমাধানে আলোচনার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ জন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে; ৬৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ২৪৩ জনের তথ্য রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ১ হাজার ৯৭০ জন।

পুলিশের হিসাবে, শিশু নিখোঁজের পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক কলহ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব এবং পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি করার সুবিধা চালুর পর নিখোঁজের তথ্য নথিভুক্ত করার সুযোগ সহজ হয়েছে। ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছিল।

তবে নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরির সংখ্যা এবং বাস্তবে নিখোঁজ শিশুর মোট সংখ্যা এক বিষয় নয়। একইভাবে, সব নিখোঁজের ঘটনাকে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছাড়ার ঘটনা হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অপহরণ, পাচার, পারিবারিক বিরোধ, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য অপরাধের আশঙ্কাও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হয়।

শিশুদের নিয়ে কাজ করা সতর্কতামূলক সংস্থা মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ১৭ শিশু ও কিশোর-কিশোরী খুন হয়েছে বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ৫৫ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দুজন করে, মে-জুনে আটজন, আগস্টে একজন এবং সেপ্টেম্বরে চার শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে সংস্থাটির তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তবে নিখোঁজ শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সম্ভাব্য অপরাধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী নাবিলা ইদ্রিস বলেন, “কিশোরীদের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতার মূল কারণ পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া। আগে যেখানে আমরা মাঠে খেলতে যেতাম, সেখানেই আমাদের বন্ধু তৈরি হতো। কিন্তু এখন মাঠ নেই, বাচ্চারা ঘরের মধ্যেই থাকে। সেখানে সামাজিক মাধ্যমে তাদের বন্ধু তৈরি হচ্ছে। এই বন্ধুদের মধ্যে আসলে কয়জন তাদের বন্ধু হওয়ার যোগ্য, সেগুলো তো দেখা হচ্ছে না। অসম বন্ধুত্ব হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “শুধু কিশোরী না, কিশোরদের মধ্যেও এই প্রবণতা আছে। যে কারণে কিশোর গ্যাং হচ্ছে। অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন যত দুর্বল হতে থাকবে, ততই এই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকবে।”

নাবিলা ইদ্রিসের মতে, শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ খেলাধুলার পরিবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দৃঢ় করাও জরুরি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, “১২ থেকে ১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীদের মনোজগৎ একটু ভিন্ন। তারা যেমন অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, তেমনি পরিবারের কড়া শাসন তাদের ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। সমস্যাগুলো শুনতে হবে।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনেক বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটান না। নিজেরা বাসায় থাকলেও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। ফলে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছে, সে বিষয়ে খোঁজ রাখা হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীরা ভুল সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, সন্তানদের প্রতি নজরদারি এবং তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। শুধু নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং সন্তান কেন বাড়ি ছাড়তে চাইছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং কোন সমস্যার কারণে পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখানো জরুরি। অপরিচিত কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়া, তার পরিচয় যাচাই না করে দেখা করতে যাওয়া কিংবা তার দেওয়া প্রস্তাবে বাড়ি ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে।

কিশোরীদের বাড়ি ছাড়ার ঘটনাগুলো শুধু পারিবারিক শাসন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকা পরিস্থিতি, শিশুর মানসিক অবস্থা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অপরাধের বিষয় আলাদাভাবে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন বা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

কৈশোরে আবেগ, কৌতূহল ও স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। এই সময় শিশুদের প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, আস্থার সম্পর্ক এবং নিজের কথা বলার সুযোগ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ সম্মিলিতভাবে সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারলে বাড়ি ছেড়ে বিপদের মুখে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ