সর্বস্ব হারিয়েও কেন মানুষ শেয়ারবাজার ছাড়ে না

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে একটি প্রশ্ন বহু বছর ধরেই ঘুরেফিরে আসে— এত লোকসান, এত হতাশা, এত অভিযোগের পরও মানুষ কেন বারবার এই বাজারে ফিরে আসে? কেন একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী কয়েক লাখ টাকা হারিয়েও আবার নতুন আশায় শেয়ার কেনেন? কেন ধসের পরও ব্রোকারেজ হাউসের মনিটরের সামনে বসে থাকেন হাজারো মানুষ?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন, দ্রুত আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমাজের আর্থিক বাস্তবতা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত তিন দশকে একাধিক বড় ধস দেখেছে। ১৯৯৬ সালের ভয়াবহ ধসের স্মৃতি এখনও অনেকে ভুলতে পারেননি। এরপর ২০১০-১১ সালের বুদবুদ সৃষ্টি ও ধস লাখো বিনিয়োগকারীর জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। সেই ধসের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। এরপরও নানা সময়ে বাজারে সাময়িক উত্থান এসেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আস্থা তৈরি হয়নি।

রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন এসেছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে, আইন সংশোধন হয়েছে— কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের অভিযোগ একই রয়ে গেছে, ‘বাজারে আমরা হারি, অন্য কেউ লাভ করে।’

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর বাজার

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় বাস্তবতা হলো এটি এখনও মূলত খুচরা বা ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীনির্ভর। বিশ্বের উন্নত বাজারগুলোতে পেনশন ফান্ড, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল বা বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই কাঠামো এখনও দুর্বল।

ফলে বাজারের বড় অংশ পরিচালিত হয় আবেগ, গুজব এবং স্বল্পমেয়াদি মুনাফার প্রত্যাশায়। অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী তখনই বাজারে প্রবেশ করেন, যখন কোনও শেয়ারের দাম ইতোমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক গ্রুপ, অনানুষ্ঠানিক টিপস বা ব্রোকারেজ হাউসের কথাবার্তার ভিত্তিতে তারা সিদ্ধান্ত নেন।

অন্যদিকে তুলনামূলক তথ্যসমৃদ্ধ ও অভিজ্ঞ অংশগ্রহণকারীরা ঠিক সেই সময় শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান। পরে দরপতনের সময় আবার কম দামে শেয়ার কিনে বাজারে ফেরেন। অর্থাৎ বাজারের একটি বড় অংশে সম্পদের স্থানান্তর ঘটে কম জ্ঞানসম্পন্ন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেশি প্রস্তুত অংশগ্রহণকারীদের হাতে।

মানুষ কেন বারবার ফিরে আসে?

প্রশ্ন হলো, এত ক্ষতির পরও সাধারণ মানুষ কেন শেয়ারবাজার ছাড়েন না?

এর একটি বড় কারণ হলো, বিকল্প বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা। ব্যাংকে আমানতের সুদ অনেক সময় মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে। জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে বড় মূলধন প্রয়োজন। ব্যবসা শুরু করার ঝুঁকি অনেকের পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে শেয়ারবাজার এমন একটি জায়গা, যেখানে তুলনামূলক কম অর্থ নিয়েও বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়।

আরেকটি কারণ মনস্তাত্ত্বিক। মানুষ সাধারণত ক্ষতি মেনে নিতে চান না। একজন বিনিয়োগকারী যখন পাঁচ লাখ টাকা হারান, তখন তিনি প্রায়ই ভাবেন, ‘আরেকটু অপেক্ষা করলে হয়তো বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।’ এই আশা তাকে বাজারে ধরে রাখে। পরে নতুন করে কিছু টাকা বিনিয়োগ করে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

এছাড়া বাজারে হঠাৎ উত্থানের গল্পও মানুষকে টানে। কোনও পরিচিত ব্যক্তি অল্প সময়ে দ্বিগুণ লাভ করেছেন, এমন গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে’ এমন মানসিকতা তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘হার্ড বিহেভিয়ার’ বা দলবদ্ধ আচরণ।

জেড ক্যাটাগরির ‘জম্বি’ কোম্পানি

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানির উপস্থিতি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি কোম্পানি বছরের পর বছর পড়ে আছে। এসব কোম্পানির অনেকেই নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় না, সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা করে না, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না কিংবা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ অবস্থায় পরিচালনা করে।

তারপরও এসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে লেনদেন হয়। কখনও কখনও এসব শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকাতেও উঠে আসে।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, এগুলো অনেকটা ‘জম্বি কোম্পানি’, যাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল, কিন্তু বাজারে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে। কম ফ্রি-ফ্লোট ও কম মূলধনি হওয়ায় এসব শেয়ার সহজে কারসাজির শিকার হয়। দাম দ্রুত বাড়িয়ে পরে বিক্রি করে দেওয়ার ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশলের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।

অর্থনীতির চাপও বাড়াচ্ছে সংকট

শুধু বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপও শেয়ারবাজারকে দুর্বল করে তুলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব উৎপাদন ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলোর আয় কমিয়ে দিয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে তালিকাভুক্ত উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানি হয় লোকসান করেছে, নয়তো আগের তুলনায় কম মুনাফা করেছে। অনেক কোম্পানি আবার আর্থিক প্রতিবেদনই প্রকাশ করেনি।

যেসব কোম্পানি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না, তাদের অনেকের ব্যবসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।

হতাশা বাড়ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে

মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে এখন প্রায়ই এক ধরনের নিস্তব্ধতা দেখা যায়। বড় মনিটরে সূচকের লাল-সবুজ ওঠানামা চললেও আগের মতো উৎসাহ নেই অনেকের মধ্যে।

একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, সাড়ে আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন সেটা তিন লাখ টাকার কাছাকাছি নেমে এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর ভেবেছিলাম বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু এখন আবার টানা দরপতন চলছে। মনে হয়, এই ক্ষতি আর কোনও দিন কাটিয়ে উঠতে পারবো না।

তার এই অভিজ্ঞতা একা নয়। বাজারে লাখো বিনিয়োগকারীর হতাশা এখন প্রায় একই রকম।

তবে কি শেয়ারবাজার শুধু ক্ষতির জায়গা

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যাটা শেয়ারবাজারের ধারণায় নয়; সমস্যাটা বাজারের সুশাসন, কাঠামো ও বিনিয়োগ সংস্কৃতিতে।

একটি কার্যকর পুঁজিবাজার আসলে অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ে। বিপরীতে শক্তিশালী পুঁজিবাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগান দিতে পারে।

উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই ভারসাম্য তৈরি করেছে। প্রতিবেশী ভারতও প্রযুক্তিনির্ভরতা, তথ্যপ্রকাশ, মিউচুয়াল ফান্ড সংস্কৃতি ও বিনিয়োগ শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।

বাংলাদেশে কী করা জরুরি

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি বিষয় জরুরি হয়ে পড়েছে।

১. দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

বছরের পর বছর লোকসান করা, আর্থিক প্রতিবেদন না দেওয়া বা কার্যক্রম বন্ধ কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা ডিলিস্টিংয়ের আওতায় আনতে হবে।

২. বাজার নজরদারি জোরদার

কারসাজি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত জরিমানা, লেনদেন নিষেধাজ্ঞা ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. ব্রোকারেজ হাউসের জবাবদিহি

গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রকাশ নিশ্চিত না হলে বাজারে আস্থা ফিরবে না। সাময়িক মুনাফার বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী ধরে রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

৪. মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সংস্কার

মাসিক পারফরম্যান্স, পোর্টফোলিও, ফি, এনএভি ও ঝুঁকি– তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে। পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনা ছাড়া সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে না।

৫. বিনিয়োগ শিক্ষা

সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখানেই। এখনও অনেক মানুষ শেয়ারবাজারকে ‘দ্রুত ধনী হওয়ার জায়গা’ মনে করেন। অথচ সফল বিনিয়োগ মূলত দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং ধৈর্যের বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই আর্থিক শিক্ষা বাড়ানো দরকার। বিভাগীয় শহরগুলোতে বিনিয়োগ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত।

৬. নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম

কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, লভ্যাংশ ইতিহাস, ঋণের পরিমাণ, আয়ের প্রবণতা ও খাতভিত্তিক তুলনা সহজভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কমবে।

ঝুঁকির আড়ালেও সম্ভাবনা

শেয়ারবাজারে ঝুঁকি থাকবে, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু ঝুঁকি আর অনিয়ম এক বিষয় নয়। একটি সুস্থ বাজারে বিনিয়োগকারী জানবেন, তিনি লাভও করতে পারেন, ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু তিনি অন্তত বিশ্বাস করবেন, বাজারটি ন্যায্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষ এখনও শেয়ারবাজার ছেড়ে যাননি, এটাই বড় বার্তা। এর অর্থ, মানুষের ভেতরে এখনও আশা আছে। তারা এখনও বিশ্বাস করতে চান, একদিন এই বাজার স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজার শুধু কিছু সংখ্যার খেলা নয়। এটি মানুষের ভবিষ্যৎ, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আর সেই প্রতিষ্ঠানকে আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা এখন শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, পুরো অর্থনীতির স্বার্থেই জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ