এবারের প্রতিপাদ্য: ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’

জাতীয় যুব দিবস: দক্ষ যুবশক্তিই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর। তারুণ্য মানেই স্বপ্ন, সম্ভাবনা, সাহস, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এই তারুণ্যকে সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও দক্ষতার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারলে একটি দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আর তরুণদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে বিপুল জনশক্তিই পরিণত হতে পারে জাতীয় উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জে।

জাতীয় যুব দিবস আমাদের সেই সম্ভাবনা ও দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। প্রতিপাদ্যটির মধ্যে রয়েছে একটি বৈষম্যহীন, কর্মমুখী, আত্মনির্ভরশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। যেখানে যুবসমাজ শুধু চাকরির প্রত্যাশী হবে না, বরং নিজেদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারে কর্মজগতের ধরন বদলে যাচ্ছে। একসময় যে কাজের জন্য প্রচলিত শিক্ষাগত যোগ্যতা যথেষ্ট ছিল, এখন সেখানে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা এবং সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন হচ্ছে।

বাংলাদেশের তরুণদের সামনে তাই নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা দিয়ে কর্মজীবনে সফল হওয়া কঠিন। প্রয়োজন বাজারের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষি, শিল্প, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন তরুণও যেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারেন, অনলাইনে কাজ করতে পারেন কিংবা আধুনিক কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে যুক্ত হতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা শিক্ষিত বেকারত্ব। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছে। অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়ে গেছে।

এই ব্যবধান দূর করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কর্মমুখী শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

দক্ষ যুবসমাজ গড়ার ক্ষেত্রে তরুণীদের পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম ও শহরের তরুণীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী তরুণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যুবকদের জন্যও সমান সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

জাতীয় যুব দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হতে হবে তরুণদের বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং তাঁদের সম্ভাবনা বিকাশের কার্যকর উদ্যোগ।

বাংলাদেশের তরুণেরা অতীতে বিভিন্ন সংকটে সাহস, নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনেও তরুণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই শক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করতে হলে তাঁদের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

মাদক, অপরাধ, হতাশা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণদের দূরে রাখতে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সহনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, যুবসমাজ কেবল দেশের ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁদের মেধা ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু জনসংখ্যার বিচারে নয়, দক্ষ মানবসম্পদের শক্তিতেও বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

জাতীয় যুব দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য তাই কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। তরুণদের দক্ষ করে তোলা, তাঁদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ দক্ষ যুবশক্তি ছাড়া সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তারুণ্যের মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতার সম্মিলনেই গড়ে উঠতে পারে এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সবার ঘরে, নিশ্চিত হবে সবার অধিকার এবং বাস্তবায়িত হবে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ