প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ৯ হাজার মাইলের উষ্ণ পানির ঢেউ, ধেয়ে আসছে সুপার এল নিনো!

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে এগিয়ে চলেছে উষ্ণ পানির এক বিশাল ঢেউ। এর বিস্তৃতি প্রায় ৯ হাজার মাইল। বিজ্ঞানীরা একে তুলনা করছেন বিশাল মালবাহী ট্রেনের সঙ্গে। সমুদ্রের উপরিভাগে সাধারণ ঢেউয়ের মতো দেখা না গেলেও পানির নিচে এই উষ্ণ প্রবাহ বহন করছে বিপুল তাপ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘কেলভিন ওয়েভ’। আর এই ঢেউকে ঘিরেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এটি চলমান এল নিনো পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এমনকি ২০২৬-২৭ সালে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করতে পারে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সুপার এল নিনো।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (নোয়া) এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পর্যবেক্ষণে প্রশান্ত মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, সমুদ্রের গভীরে চলমান এই উষ্ণ পানির ঢেউয়ের কিছু অংশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। নোয়ার জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মিশেল এল’হিউরেক্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান কেলভিন ওয়েভের শক্তি ১৯৯৭ সালের এল নিনোর সময়কার ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনীয়। তবে শুধু এই ঢেউয়ের ভিত্তিতে এল নিনোর চূড়ান্ত শক্তি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কেলভিন ওয়েভ কোনো সাধারণ সমুদ্রের ঢেউ নয়। এটি সমুদ্রের ওপরের স্তর ও গভীর পানির মধ্যবর্তী অঞ্চলে সৃষ্ট দীর্ঘ, ধীরগতির উষ্ণ পানির প্রবাহ। প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে ইন্দোনেশিয়া ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি জমা থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহ বা ট্রেড উইন্ড এই পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে রাখে।

কিন্তু কোনো কারণে এই বাতাস দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা বিপরীত দিকে প্রবাহিত হলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। এ সময় সমুদ্রের গভীরে তৈরি হয় কেলভিন ওয়েভ।

যুক্তরাষ্ট্রের নোয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ঢেউ ঘণ্টায় প্রায় ৫ থেকে ১০ মাইল গতিতে চলতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। এর দৈর্ঘ্য হাজার হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এটি সমুদ্রের স্বাভাবিক ঢেউয়ের মতো তীরে আছড়ে পড়ে না। বরং পানির নিচ দিয়ে তাপ পরিবহন করে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটায়।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের নিরক্ষীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এর আবির্ভাব ঘটে। এর বিপরীত পরিস্থিতিকে বলা হয় লা নিনা।

এল নিনো শক্তিশালী হলে শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই পরিবর্তন সীমাবদ্ধ থাকে না। সমুদ্রের ওপরের বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়, বাতাসের চাপের বিন্যাস বদলে যায় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, খরা, তাপপ্রবাহ ও ঝড়ের ধরনে পরিবর্তন আসে।

সুপার এল নিনো বলতে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে বোঝায়। এ ধরনের ঘটনায় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যায়। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। এর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা, দাবানল ও কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল।

এবারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। নাসার ১৫ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোয়ার হিসাবে ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা এবার সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।

নোয়ার জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র ৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এল নিনো ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শক্তিশালী থেকে অতি শক্তিশালী এল নিনো বজায় থাকার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশের বেশি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কালে ১৯৫০ সালের পরের ঘটনাগুলোর তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) ৮ অক্টোবরের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলমান এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর প্রভাব পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও দেখা দেয় দীর্ঘস্থায়ী খরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পানির সংকট, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা আগে থেকেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে। ২০২৭ সালেও উষ্ণতার চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, নদ-নদী, পানিসম্পদ ও মানুষের জীবনযাত্রা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে কৃষিতে সেচের চাহিদা, পানির প্রাপ্যতা এবং ফসলের উৎপাদন নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন কৃষি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব সব সময় একই রকম হয় না। ১৯৮১ থেকে ২০২১ সালের বৃষ্টিপাতের তথ্য নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বর্ষার বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক বেশ জটিল। শুধু এল নিনোর পূর্বাভাস দিয়ে দেশের বৃষ্টিপাত বা বন্যার পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি এবং মৌসুমি বায়ুর আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা আগামী কয়েক মাসের বৈশ্বিক আবহাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কেলভিন ওয়েভের গতিপ্রকৃতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তবে কেলভিন ওয়েভ নিজে কোনো সুনামি বা সরাসরি ধ্বংসাত্মক সমুদ্রঢেউ নয়। এর ভয়াবহতা লুকিয়ে রয়েছে জলবায়ুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে। তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়াই জরুরি।

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে চলমান এই উষ্ণ পানির বিশাল প্রবাহ শেষ পর্যন্ত কতটা শক্তিশালী এল নিনো তৈরি করবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু নোয়া, নাসা ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পর্যবেক্ষণ একটি বিষয় স্পষ্ট করছে ২০২৬-২৭ সালের বৈশ্বিক আবহাওয়ার জন্য সামনে অপেক্ষা করছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ