বিচার বিভাগ পৃথককরণ দিবস আজ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শেষ পরীক্ষা, পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অপেক্ষা

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিন আজ ১ নভেম্বর। বিচার বিভাগ আজও তার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার স্বাদ পাননি কর্মকর্তারা। বিচারিক কাজে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই রয়ে গেছে জটিলতা। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব এবং পৃথক সচিবালয়ের অনুপস্থিতি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে রেখেছে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবার সেই জটিলতা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত খসড়া অধ্যাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সচিবালয়ের আর্থিক স্বাধীনতা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথ পুরোপুরি মসৃণ হচ্ছে না।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তাই কেবল প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ক্ষমতার পাশাপাশি আর্থিক স্বাধীনতাও কতটা নিশ্চিত করা হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি হলো মাসদার হোসেন মামলা। ১৯৯৫ সালে বিচার বিভাগের ৪৪১ জন কর্মকর্তা নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করেন। মামলাটি পরবর্তী সময়ে বিচারক মাসদার হোসেনের নামে পরিচিতি পায়। ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট এবং ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ এ বিষয়ে ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কিন্তু রায় বাস্তবায়নে সময় লাগে দীর্ঘ আট বছর। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়। পৃথক বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি চালুর মধ্য দিয়ে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। ওই দিন ২১৮ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৭০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়।

তবে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতাও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরং পৃথককরণের পরও অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে দ্বৈত ব্যবস্থা থেকে যায়, সেটিই পরবর্তী সময়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শুধু বিচারককে রায় দেওয়ার স্বাধীনতা দিলেই চলে না। তাঁর নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়েও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এই প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বিচারিক দায়িত্ব পালনকারী বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ছিল। কিন্তু পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এমন বিধান যুক্ত হয়। বাস্তবে এসব প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের প্রশ্নটি থেকেই যায়।

এর ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক ধরনের দ্বৈতশাসনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্ট অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করলেও বিচারকদের চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা বজায় থাকে। এই ব্যবস্থাকে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখেছেন আইনজ্ঞ ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বিচার বিভাগের এই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৭ অক্টোবর ২০২৪ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

প্রস্তাবে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশের খসড়া, প্রস্তাবিত সচিবালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সরকারের কার্যবিধি ও দায়িত্ব বণ্টনসংক্রান্ত বিধিমালা সংস্কারের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা।

সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাবের মূল বক্তব্য ছিল, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় বিচার বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির হাতে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব কমবে বলে প্রত্যাশা করা হয়।

পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আইনি লড়াইও চলতে থাকে। ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত রিট মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন।

রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক ও স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়। অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও রায়ে গুরুত্ব পায়। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের মূল দর্শন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন সামনে আসে।

তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। ২০২৬ সালের ৯ জুন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। ফলে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে আইনি বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়।

পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অবশ্য শুধু প্রস্তাব ও আদালতের নির্দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে ২০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এবং ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়।

এই অধ্যাদেশে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক সচিবালয়ের বিধান রাখা হয়েছিল। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও ছুটিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচিবালয়ের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়। সচিবালয়ের সার্বিক কর্তৃত্ব প্রধান বিচারপতির হাতে রাখার বিধানও ছিল।

কিন্তু এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের বিল পাস হয়। এর ফলে অধ্যাদেশটির ভিত্তিতে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনি কাঠামো আর বহাল থাকেনি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

অর্থাৎ, পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ একপর্যায়ে অধ্যাদেশ জারি পর্যন্ত পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা বাতিল হয়ে যায়। পাশাপাশি হাইকোর্টের রায়ের ওপর আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ থাকায় বিষয়টি এখনো আইনি ও সাংবিধানিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো আর্থিক স্বাধীনতা। একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিকভাবে স্বতন্ত্র ঘোষণা করলেই তার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন, অর্থ বরাদ্দ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, জনবল নিয়োগ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতাও থাকতে হয়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ