১০ টাকার ভাড়া ২০, ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা; ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হলেও এখনো প্রজ্ঞাপন হয়নি—বাড়তি ভাড়া নিলে রুট পারমিট বাতিলের হুঁশিয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি বাসভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা, আবার ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা। কোনো কোনো রুটে ৬০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৮০ টাকা। এতে আগের ভাড়ার তুলনায় যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ৩৩ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি টাকা।
যদিও মঙ্গলবার দুপুরে ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে সরকারি নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও সড়কে মঙ্গলবার ঘুরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের এমন চিত্র পাওয়া গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, চালকেরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কথা বলে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন। তবে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার পক্ষে কোনো সরকারি কাগজ বা নতুন ভাড়ার তালিকা দেখাতে পারছেন না তারা।
সাভার থেকে টেকনিক্যাল এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেন ফারজানা আহমেদ। তিনি বলেন, আগে এ পথে ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ইসলামপুর যেতে আগে ৬০ টাকা লাগলেও এখন ৮০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত দুই দিন ধরে তেলের দাম বাড়ার কথা বলে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
বলিয়াপুর থেকে কোরিয়ার টেকনিক্যাল মোড়ে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী মো. আশফাক রহমান বলেন, আগে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন ২০ টাকা নেওয়া হয়েছে। চালকেরা তেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এ বাড়তি ভাড়া বড় চাপ তৈরি করছে।
যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা হলে ভাড়া বাড়ে ১০০ শতাংশ। ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা হলে বাড়ে ৫০ শতাংশ। আর ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা হলে ভাড়া বাড়ে ৩৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই কোনো কোনো রুটে পুরোনো ভাড়ার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
তবে সব বাসে এমন বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ নেই। শুভযাত্রা পরিবহনের চালক মো. তুহিন মিয়া বলেন, তাঁদের ভাড়া বাড়েনি। তবে তেলের দাম বাড়ায় প্রতিটি আপ-ডাউন ট্রিপে জ্বালানি খরচ প্রায় ২ হাজার টাকা বেড়েছে। সরকার নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলে সেটিই তাঁরা কার্যকর করবেন বলে জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সদর দপ্তরে বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে বাস মালিকেরা কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান। পরে আলোচনায় ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা। নতুন হার কার্যকর হলে তা হবে ২ টাকা ৭০ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ২ টাকা ৫৯ পয়সা। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে বর্তমান কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা; নতুন হার হবে ২ টাকা ৪০ পয়সা।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন রুটের দূরত্ব অনুযায়ী নতুন ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে প্রকাশ করা হবে। এতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বাসভাড়া সমন্বয়ের প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় বিআরটিএ কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। তবে মন্ত্রণালয় তা কমিয়ে ১৭ পয়সা নির্ধারণ করেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল।
সরকারি সিদ্ধান্তের আগে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নিলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হবে।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি ও পরিবহন খাতের ব্যয় বিবেচনায় আলোচনা করে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারের এই অবস্থানের পরও প্রজ্ঞাপন জারির আগেই বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে নজরদারি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ক্ষেত্রে কিলোমিটারভিত্তিক নতুন ভাড়া কার্যকর করার পরিবর্তে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
এদিকে সরকার নির্ধারিত ১৭ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৮ পয়সা এবং সিটি সার্ভিসে ১০ পয়সা বাড়ালেই জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম সমন্বয় করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নেই। বাস ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বৈঠক হলেও যাত্রীদের মতামত নেওয়া হয় না। পরিচালন ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং কত পয়সা ভাড়া বাড়ালে সেই ব্যয় সমন্বয় হবে—এ বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে না।
ফলে একদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন মালিকদের ব্যয় বাড়ার যুক্তি, অন্যদিকে সরকারি নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ—দুইয়ের মাঝখানে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। এখন নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি এবং তা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।