শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, ১৭ সেপ্টেম্বরের রক্তে লেখা অধিকার

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শরীফ কমিশন থেকে ১৯৬২-এর রক্তাক্ত শিক্ষা আন্দোলন—যে আন্দোলন বদলে দিয়েছিল বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার গতিপথ

১৭ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে দিনটি শুধু একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি শিক্ষার অধিকার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের প্রবর্তিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা ও বাবুলসহ অনেকে নিহত হন। পরে দিনটি ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাপিডিয়ার ইতিহাসবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বরের ধর্মঘটের দিন পুলিশের গুলিতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী নিহত এবং প্রায় ২৫০ জন আহত হন।

কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বরকে শুধু তিনজন শহীদের নাম উচ্চারণ করে স্মরণ করলে এই দিনের তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য, শিক্ষার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার প্রতিবাদ এবং সর্বোপরি শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন তাই কেবল একটি শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মতো শিক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেন। ক্ষমতা দখলের অল্প সময়ের মধ্যেই, ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, পাকিস্তান সরকার জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে। পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব এস এম শরীফকে চেয়ারম্যান করে গঠিত কমিশনটি পরে ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত হয়।

কমিশন শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর নিয়ে সুপারিশ দেয়। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, পরীক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষকতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা নিয়েও মতামত দেওয়া হয়।

কমিশনের কিছু সুপারিশ ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনকেন্দ্রিক। এর মধ্যে ডিগ্রি কোর্স তিন বছর করার প্রস্তাব, মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব, উচ্চশিক্ষায় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় ছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ কমিশনের বেশ কিছু সুপারিশকে নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখেছিল। বিশেষ করে ভর্তি ও পদোন্নতিতে কঠোর শর্ত, উচ্চশিক্ষায় সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা, ইংরেজি ভাষার বাড়তি চাপ এবং শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে তীব্র আপত্তি তৈরি হয়।

এখানেই প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে—শিক্ষা কি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নাকি আর্থিক সামর্থ্য ও কঠোর বাছাইয়ের কারণে বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষার বাইরে চলে যাবে?

এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে ছাত্রসমাজকে আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।

শরীফ কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ছিল শিক্ষার ব্যয়ভার নিয়ে। কমিশন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে—সে বিষয়ে সুপারিশ করেছিল।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কমিশন প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয়ে সরকার ও জনগণের যৌথ অংশগ্রহণের কথা বলেছিল। মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যয়ের তিন-পঞ্চমাংশ ফি থেকে আসার প্রস্তাবও ছিল। উচ্চশিক্ষায় আগের তুলনায় জনগণের বড় অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল।

একটি দরিদ্র ও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে এ ধরনের প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কারণ শিক্ষার খরচ বাড়লে প্রথম আঘাত পড়ে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। যে পরিবারটি সন্তানকে বিদ্যালয় বা কলেজে পাঠাতে হিমশিম খায়, সেখানে অতিরিক্ত ফি উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের আপত্তির একটি জায়গা ছিল এখানেই। শিক্ষা যদি রাষ্ট্রের দায়িত্বের পরিবর্তে ক্রমে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে শিক্ষার সুযোগে শ্রেণিগত বিভাজন আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কা আন্দোলনের পেছনে শক্তি জোগায়।

শিক্ষা নিয়ে অসন্তোষ একদিনে তৈরি হয়নি। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছিল। ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তখনও তাজা। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ১৯৫২ সালের আন্দোলনে ছাত্রসমাজ যে ভূমিকা রেখেছিল, তার ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনেও তারা সামনে আসে।

শরীফ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ এর বিভিন্ন সুপারিশের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করে। বাংলাপিডিয়া বলছে, কমিশনের রিপোর্ট পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার, ভর্তি ও পদোন্নতির কঠোরতা, উচ্চশিক্ষায় সুযোগের সীমাবদ্ধতা, তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স, উচ্চমাধ্যমিকে ইংরেজির চাপ এবং শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয় আন্দোলনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ আন্দোলনের প্রশ্নটি ছিল বহুমাত্রিক। শুধু পাঠ্যসূচি বা পরীক্ষাপদ্ধতি নয়—শিক্ষায় প্রবেশের অধিকার, শিক্ষার ব্যয়, ছাত্রদের মতপ্রকাশের অধিকার এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ—সবকিছু মিলেই ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।

১৯৬২ সালে শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সভা, মিছিল, ধর্মঘট ও প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের মধ্যে আন্দোলনের প্রস্তুতি জোরদার হয়।

আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হতে থাকে। বাংলাপিডিয়ার ইতিহাসবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আন্দোলন আরও বৃহত্তর কর্মসূচির দিকে যায়।

শেষ পর্যন্ত ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতালের কর্মসূচি দেওয়া হয়।

সেদিন ঢাকা শহর পরিণত হয় প্রতিবাদের কেন্দ্রে।

১৭ সেপ্টেম্বরের আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় ঘটে ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায়। আন্দোলনরত ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। সরকারি শিক্ষক বাতায়নের বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণেও বলা হয়েছে, হাইকোর্টের সামনে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা ও বাবুল নিহত হন।

সেদিনের রক্তপাত আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়নি। বরং শহীদের রক্ত আন্দোলনের দাবিকে আরও শক্তিশালী করে।

প্রশ্ন উঠেছিল—শিক্ষার অধিকার চাইতে গিয়ে কেন ছাত্রকে গুলির মুখে পড়তে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ১৯৬২ সালের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে খুঁজলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কারণ শিক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে তখন যুক্ত হয়েছিল নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বৃহত্তর প্রশ্ন।

১৯৬২ সালের রক্তাক্ত ঘটনার পর ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটি ছাত্রসমাজের কাছে বিশেষ তাৎপর্য পায়। পরবর্তী সময়ে এটি ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হতে থাকে।

এই আন্দোলনের একটি বড় অর্জন ছিল—শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের নীতিকে প্রকাশ্য বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও চরিত্র নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।

বাংলাপিডিয়ার ইতিহাসে বলা হয়েছে, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের ফলে সরকার শেষ পর্যন্ত শরীফ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে এই আন্দোলন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করে।

অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর শুধু একটি আন্দোলনের সমাপ্তির স্মৃতি নয়; এটি পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুও।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বারবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান—বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রদের সক্রিয়তা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের বিশেষত্ব হলো, এটি শিক্ষার মতো একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হলেও খুব দ্রুত রাষ্ট্রের চরিত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

শিক্ষার সুযোগ কারা পাবে? রাষ্ট্রের অর্থ কোথায় ব্যয় হবে? ছাত্রদের মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে কি না? শিক্ষানীতি প্রণয়নে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতামতের গুরুত্ব কতটুকু? শিক্ষা কি নাগরিক অধিকার, নাকি পণ্য? এসব প্রশ্ন তখন যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজও তেমনি প্রাসঙ্গিক।

ইতিহাসকে শুধু ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ দুই ভাগে ভাগ করলে ঘটনাটির জটিলতা হারিয়ে যায়। শরীফ কমিশনের রিপোর্টে এমন কিছু সুপারিশও ছিল, যেগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছিল।

বাংলাপিডিয়া বলছে, কমিশন সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বৃত্তি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং গবেষণার মতো বিষয়েও সুপারিশ করেছিল।

সমস্যা তৈরি হয়েছিল এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কাঠামো, শিক্ষাব্যয় এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজের কাছে কমিশনের সামগ্রিক নীতি বৈষম্য বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছিল।

এ কারণেই ইতিহাসের বিচারে ১৯৬২ সালের আন্দোলনকে শুধু ‘একটি রিপোর্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ’ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়।

আজকের দিনে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আলোচনায় প্রায়ই চাকরি, দক্ষতা, বাজারের চাহিদা ও প্রতিযোগিতার বিষয় সামনে আসে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার আরেকটি মৌলিক পরিচয় আছে।

শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে শেখায়। অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখায়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখায়।

১৯৬২ সালের ছাত্ররা যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল শিক্ষার সুযোগ। কিন্তু সেই প্রশ্ন ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে।

এ কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর এলেই শহীদ ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা ও বাবুলের নাম উচ্চারিত হয়। বিভিন্ন ছাত্র, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করে। শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই শিক্ষা দিবসকে সীমাবদ্ধ রাখব?

শিক্ষা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে আজকের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। শিক্ষার ব্যয় কতটা নাগালের মধ্যে? গ্রাম ও শহরের শিক্ষার সুযোগে কতটা পার্থক্য? দরিদ্র পরিবারের সন্তান উচ্চশিক্ষায় কতটা যেতে পারছে? ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কত? কারিগরি শিক্ষার সুযোগ কতটা বিস্তৃত? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশের পরিবেশ কেমন? শিক্ষার মান ও সুযোগ কি সবার জন্য সমান?

এসব প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ১৭ সেপ্টেম্বরের স্মৃতিকে জীবন্ত রাখবে।

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। বরং একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মতামত থাকা স্বাভাবিক।

শরীফ কমিশন নিয়ে ছাত্রদের আপত্তি শুধু একটি কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে ছিল না। এর মধ্যে তারা দেখতে পেয়েছিল ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য কাঠামো, যেখানে সুযোগ ও ব্যয়ের প্রশ্নটি তাদের কাছে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।

আন্দোলনের পথে তারা রক্ত দিয়েছে। সেই রক্তের স্মৃতিই ১৭ সেপ্টেম্বরকে আলাদা করেছে।

আজ ৬৪ বছর পর সেই দিনটির দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কখনোই শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। শিক্ষা একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কোন শিশু কতদূর পড়বে, কে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে, কে পিছিয়ে থাকবে—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি দেশের সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব।

তাই ১৭ সেপ্টেম্বর কেবল অতীতের একটি রক্তাক্ত দিনের স্মরণ নয়। এটি একটি প্রশ্নের দিনও—আমরা কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই?

এমন শিক্ষা, যেখানে অর্থের কারণে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। এমন শিক্ষা, যেখানে প্রশ্ন করার অধিকার থাকবে। এমন শিক্ষা, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার নম্বরের জন্য নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
এমন শিক্ষা, যেখানে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে নাগরিকের সম্ভাবনা বিকশিত করা।

১৯৬২ সালের ছাত্ররা যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তার ভাষা বদলাতে পারে; কিন্তু প্রশ্নটির গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর তাই আমাদের ইতিহাসের একটি তারিখের চেয়ে বেশি কিছু। এটি মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার অধিকার অর্জিত হয় শুধু নীতিমালায় নয়, মানুষের সচেতনতা, অংশগ্রহণ ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে।

ওয়াজিউল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, বাবুলসহ ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হতে পারে সেই অধিকারভিত্তিক শিক্ষার স্বপ্নটিকে নতুন করে দেখা।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিতে তৈরি হয় না—তার সবচেয়ে গভীর ভিত্তি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে।

আর সেই শ্রেণিকক্ষের দরজা যেন সবার জন্য খোলা থাকে—১৭ সেপ্টেম্বরের ইতিহাসের অন্যতম বড় বার্তা হয়তো এটিই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ