এলএনজিতে খরচ বেড়েছে তিন গুণ

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চুক্তির গ্যাস না আসায় স্পট মার্কেটনির্ভরতা বাড়ছে, অস্থির বাজারে একের পর এক বাড়ছে আমদানি ব্যয়

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সময়ে গ্যাস না আসায় বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। সর্বশেষ প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি কিনতে প্রায় ৩০ ডলার ব্যয় করছে সরকার।

১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া থেকে একটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর সরবরাহের জন্য এ কার্গোর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার। একই বৈঠকে যুক্তরাজ্যের টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার থেকে আরেকটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়, যার দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার।

এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে বাংলাদেশ সাধারণত স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ ডলারে কিনত। সেই হিসাবে সর্বশেষ কেনাকাটার দাম প্রায় তিন গুণে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আসে। বিশেষ করে কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে কাতারসহ কয়েকটি উৎস থেকে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে চুক্তির আওতায় নির্ধারিত এলএনজি সময়মতো পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সরবরাহ ঘাটতি পূরণে পেট্রোবাংলাকে তখন জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেটে যেতে হচ্ছে। আর অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহকারীরা বেশি দাম চাওয়ায় প্রতিটি কার্গোর পেছনে সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে।

গত কয়েক মাসে এলএনজি কেনার দামে ধারাবাহিক উল্লম্ফন দেখা গেছে। আগস্টে একটি কার্গো ২১ দশমিক ৮৭৮ ডলার এবং আরেকটি ২১ দশমিক ৭৭৮ ডলারে কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে কয়েকটি কার্গোর দাম ২৪ থেকে ২৮ ডলারের ওপরে ওঠে। পরে ভিটল এশিয়ার একটি কার্গোর দাম ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলার এবং আরামকো ট্রেডিংয়ের একটি কার্গোর দাম ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

সর্বশেষ দুটি কার্গোতে সেই দাম আরও বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে।

এলএনজির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের এলএনজি শিল্প উৎপাদনেও চাপ তৈরি করছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়, আবার উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে।

ফলে একদিকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে সরকারকে।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে স্পট মার্কেটের পাশাপাশি সরাসরি ক্রয় ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। সেপ্টেম্বরে টোটালএনার্জিসের কাছ থেকে আগামী কয়েক মাসে একাধিক কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সরবরাহের দাম জাপান-কোরিয়া মার্কার সূচকের সঙ্গে যুক্ত।

তবে সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কম দামে চুক্তি করা হলেও নির্ধারিত সময়ে এলএনজি না এলে শেষ পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় এমন পরিস্থিতিই বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব এড়ানো কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির বর্তমান উচ্চমূল্য কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ