পেট্রোবাংলা বলছে বেড়েছে, ভোক্তারা বলছেন কমেছে 

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বেড়ে ২৬১ কোটি ঘনফুট, আবাসিকে এখনও স্বাভাবিক হয়নি চাপ

শিল্পে অগ্রাধিকার, ঢাকার অনেক এলাকায় রান্নার গ্যাসের সংকট কাটেনি

দেশীয় উৎপাদন কমায় বাড়ছে এলএনজিনির্ভরতা

জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২৬১ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়, যা কয়েক দিন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। পেট্রোবাংলার হিসাবে, এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এসেছে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে প্রায় ৯৯ কোটি ঘনফুট।

তবে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়লেও এর সুফল সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় এখনো চুলা জ্বলছে না, কোথাও আবার গ্যাসের চাপ খুবই কম। ফলে পেট্রোবাংলার হিসাবে সরবরাহ বাড়লেও আবাসিক গ্রাহকদের বড় অংশের কাছে সংকট কাটার দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬১ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সরবরাহ বাড়লেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি এখনো বড়।

১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। ১৩ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ২৩৬ কোটি ঘনফুট এবং ১৪ সেপ্টেম্বর ২৩৭ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুটে পৌঁছায়। ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬১ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ২৯ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশীয় উৎপাদনের সঙ্গে আমদানি করা এলএনজি সমন্বয় করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

সরবরাহ বাড়লেও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে বাড়তি গ্যাস যাচ্ছে কোথায়?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সরবরাহের বড় অংশ শিল্প খাতে দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি কমানো এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখাই এর অন্যতম কারণ।

ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ার পরিসংখ্যানের সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকের অভিজ্ঞতার পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কিছুটা উন্নতি হলেও বনশ্রী, কলাবাগান, কাকরাইলসহ কয়েকটি এলাকায় এখনও গ্যাসের চাপ কম থাকার বা দিনের বেলায় গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির প্রভাব শিল্পাঞ্চলেও একরকম নয়। চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলোতে পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর অনেক শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন তখনও দেখা যায়নি।

এতে বোঝা যায়, জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ বাড়লেই সব এলাকায় একই সময়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে না। পাইপলাইনের সক্ষমতা, চাহিদার চাপ এবং কোন খাতে কতটা গ্যাস দেওয়া হচ্ছে এসব বিষয়ও সরবরাহের বাস্তব চিত্রকে প্রভাবিত করছে।

গ্যাস সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস আসছে। কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় দেশীয় উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ঘনফুট কমেছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে এলএনজি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় বাংলাদেশকে স্পট বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা। এর মধ্যে চারটি ইতিমধ্যে এসেছে এবং আরও পাঁচটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। ১৬, ১৮, ২৩, ২৫ ও ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যায়ক্রমে এসব কার্গো আসার কথা।

তবে এলএনজি আমদানি বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির দাম আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকলে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে। এতে গ্যাসের দাম ও সরবরাহ দুই ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে।

বর্তমানে পেট্রোবাংলার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে এটি পরিসংখ্যানগতভাবে সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে দৈনিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক আবাসিক গ্রাহক এখনো স্বাভাবিক চাপের গ্যাস পাচ্ছেন না। তাই জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ বৃদ্ধি ও ভোক্তার ঘরে গ্যাসের প্রাপ্যতা দুই বিষয়কে এক করে দেখলে সংকটের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ