বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু কবি আছেন, যাঁদের সৃষ্টি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাঁদের কবিতায় ফুটে ওঠে স্বপ্ন, সংগ্রাম, মানবতা, আত্মমর্যাদা এবং একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা। ফররুখ আহমদ তেমনই একজন মহাশক্তিমান কবি। বাংলা সাহিত্যে তিনি পরিচিত রেনেসাঁর কবি হিসেবে। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল ঐতিহ্যের গভীরতা, তেমনি ছিল জাগরণের আহ্বান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। অথচ এই প্রতিভাবান কবির জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল দুঃখ, অভাব, অসুস্থতা ও অবহেলায় পরিপূর্ণ।
১৯ অক্টোবর ২০২৬, কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করার পাশাপাশি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও এসে দাঁড়ায় যে কবি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁর স্মৃতি ও সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণে আমরা কতটা দায়িত্বশীল?
১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফররুখ আহমদ। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর কবিতার ভাষা, শব্দচয়ন, উপমা এবং চিত্রকল্প তাঁকে সমসাময়িক অনেক কবির কাছ থেকে আলাদা করেছে।
ফররুখ আহমদের কবিতায় আরব-ফারসি ঐতিহ্য, ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, বাঙালির জীবনবোধ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য শিল্পরূপ পেয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘পাঞ্জেরী’ যেন ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার এক চিরন্তন আহ্বান। সেখানে পথহারা মানুষের সামনে নতুন দিগন্তের সন্ধান, অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে যাত্রা এবং আত্মশক্তিতে জেগে ওঠার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ গ্রন্থে কবির কল্পনাশক্তি, ঐতিহ্যচেতনা ও শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। শিশু-কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন অসংখ্য কবিতা ও ছড়া। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিধি কেবল একটি বিশেষ পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নানা বয়সের পাঠকের কাছে তাঁর সৃষ্টির আলাদা আবেদন রয়েছে।
ফররুখ আহমদের জীবনকে কেবল কবিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। তাঁর সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা পর্বের সঙ্গেও তাঁর জীবন জড়িয়ে রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত তিনি ছিলেন সচেতন সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব।
তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজস্ব আদর্শ, বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা।
প্রচলিত জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, পাকিস্তান আমলে তাঁকে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ সম্মানের জন্য মনোনীত করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণের চেয়ে নিজের নীতি ও অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত তাঁর জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন সাহিত্যিককে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সৃষ্টির শিল্পগুণ, ভাষার শক্তি, সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হয়।
কর্মজীবনে ফররুখ আহমদ দীর্ঘ সময় বেতারে কাজ করেছেন। বেতারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ ও স্মৃতিময়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালন করে তিনি জীবন চালিয়ে গেছেন। কিন্তু জীবনের শেষদিকে তাঁর আর্থিক সংকট ও অসুস্থতার কথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে ১৯৭২ সালে চাকরি হারানোর কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর সংসার চালানো, চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা ও চিকিৎসার সংকটও তাঁকে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে।
১৯৭৩ সালে তাঁর এক মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা তাঁর জীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পরের বছর, ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময়কার আর্থিক দুরবস্থা ও চিকিৎসার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। একজন বড় মাপের কবির জীবনের শেষ পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেওয়া আর প্রতিভার যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
ফররুখ আহমদের সাহিত্যিক অবদানের স্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এসেছে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ১৯৮০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তনের শুরুর দিকেও তাঁর নাম বিশেষভাবে আলোচিত। তবে পুরস্কারসংক্রান্ত নির্দিষ্ট সাল ও প্রথম প্রাপক হিসেবে তাঁর অবস্থান উল্লেখ করার আগে বাংলা একাডেমির প্রামাণ্য নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একজন সাহিত্যিকের অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কিন্তু প্রকৃত সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। পাঠ্যবইয়ে তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত থাকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় শিক্ষার্থীরা ‘পাঞ্জেরী’ ও ‘তাজী’ কবিতার সঙ্গে পরিচিত হতো। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যক্রমে তাঁর ‘বৃষ্টি’ ও ‘পদ্মা’ কবিতার অন্তর্ভুক্তির কথাও আলোচনায় আসে। পাঠ্যক্রম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু কবির সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটানো জরুরি।
কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ বেতার এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। তাঁর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিককে স্মরণ করার আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আলোচনা সভা, কবিতাপাঠ, গবেষণা, প্রামাণ্যচিত্র, বেতার অনুষ্ঠান এবং তাঁর রচনাবলির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে বাংলাদেশ বেতারের কাছে তাঁর কর্মজীবনের বহু স্মৃতি, অনুষ্ঠান-সম্পর্কিত নথি ও ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলো অনুসন্ধান ও সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ গবেষকেরা উপকৃত হবেন। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং শিশু-কিশোরদের উপযোগী প্রকাশনা তাঁর সৃষ্টিকে নতুন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
ফররুখ আহমদকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর মৃত্যুর তারিখ মনে রাখা নয়; তাঁর কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তি, সৃষ্টিশীলতা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধকে নতুন করে আবিষ্কার করা। একজন কবি তাঁর জীবদ্দশায় কতটা সম্মান পেয়েছেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মৃত্যুর পর তাঁর সৃষ্টিকে আমরা কতটা জীবিত রাখতে পেরেছি।
১৯ অক্টোবর তাই শুধু একজন কবির মৃত্যুবার্ষিকী নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ যাচাইয়েরও দিন। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, বেতার কিংবা কোনো গণমাধ্যম কবিকে ঘিরে আজ কোনো আয়োজন করে থাকলে তা জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর আয়োজন না থাকলে সেই নীরবতা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার।
কারণ, ফররুখ আহমদ কেবল অতীতের একজন কবি নন; তিনি বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর কবিতা পাঠ, তাঁর জীবন নিয়ে গবেষণা এবং তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই তাঁকে যথার্থ সম্মান জানানো সম্ভব।