মেশিনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে টাঙ্গাইলের তাঁত, অনিশ্চয়তায় হাজারো কারিগরের ভবিষ্যৎ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

টাঙ্গাইল তাঁতপল্লির সকাল শুরু হয় বুননের খটখট শব্দে। ঘুম ভাঙার আগেই অনেক বাড়িতে জ্বলে ওঠে বাতি। কেউ সুতা গুছিয়ে নেন, কেউ তাঁতে বসে নকশা তোলেন, আবার কেউ আগের দিনের অসমাপ্ত শাড়ির বুনন শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একটি শাড়ির প্রতিটি সুতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের শ্রম, অভিজ্ঞতা, ধৈর্য আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবেই নিজেদের জীবনকে তাঁতের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন তাঁতিরা। তাঁদের হাতের নিপুণ ছোয়ায় তৈরি হয় এমনসব শাড়ি, যা শুধু শরীরের পোশাক নয়, বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করে।
অথচ সেই ঐতিহ্যের কারিগরদের জীবনেই আজ অনিশ্চয়তার ছায়া। যে তাঁতের শব্দ একসময় ছিল সমৃদ্ধির প্রতীক, সেই শব্দের মধ্যেই এখন মিশে আছে অভাবের দীর্ঘশ্বাস। মেশিনে তৈরি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, কম মজুরি, পুঁজি সংকট এবং বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ার চাপে অনেক তাঁতি এখন পেশা বদলের কথা ভাবছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যে ছেড়েছেন বাপ-দাদার পেশা। যাঁরা এখনও তাঁত আঁকড়ে ধরে আছেন, তাঁদের অনেকেরই প্রশ্ন এই শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব কি শুধু তাঁদেরই?
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছে। সফট সিল্ক, সুতি, জামদানি, রেশম, দোতারি, বালুচরি, স্বর্ণকাতানসহ নানা ধরনের শাড়ি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। হাতে বোনা এসব শাড়ির নকশা, বুনন ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য একে অন্য অনেক কাপড় থেকে আলাদা করেছে। পরতে আরামদায়ক হওয়ায় এবং নকশায় বৈচিত্র্য থাকায় দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের কাছে এর কদর রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি থাকলেই যে একটি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবন নিরাপদ হবে, টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লির বাস্তবতা সে কথা বলে না।
প্রায় দেড়শ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের জীবন-জীবিকা। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চণ্ডী, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রামের তাঁতপল্লিতে এখনও তৈরি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। এসব গ্রামের অনেক বাড়িতে তাঁত বসানো। কোনো পরিবারে বাবা শাড়ি বোনেন, মা সুতা প্রস্তুত করেন, পরিবারের অন্য সদস্যরা নকশা ও বুননের কাজে সহায়তা করেন। কোথাও একই বাড়িতে একাধিক তাঁত চলে। তাঁদের কাছে তাঁতশিল্প শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি পারিবারিক উত্তরাধিকার, নিজস্ব পরিচয় এবং জীবনযাপনের অংশ।
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের বিস্তারের ইতিহাসে বসাক সম্প্রদায়ের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই অঞ্চলে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। ঢাকা ও ধামরাই থেকে আসা বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় এই শিল্প গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমে টাঙ্গাইলের শাড়ি স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জন করে। নকশায় নতুনত্ব আনা, সুতা বাছাই এবং বুননের কৌশল উন্নত করার মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন কারিগরেরা।
টাঙ্গাইলের মানুষের মুখে প্রচলিত রয়েছে, ‘নদী-চর খাল-বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন।’ এই কথার মধ্যে রয়েছে একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয়। কিন্তু সেই গর্বের ধন যাঁদের শ্রমে তৈরি, তাঁদের জীবন কতটা স্বচ্ছল সেই প্রশ্ন সামনে আনা জরুরি।
পাথরাইলের তাঁতপল্লিতে গেলে বোঝা যায়, একটি শাড়ি তৈরির পেছনে কতটা সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। সুতা প্রস্তুত করা, রং করা, নকশা ঠিক করা এবং তাঁতে বসে একের পর এক সুতা বুনে কাপড় তৈরি করা প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা ও মনোযোগ। সাধারণ শাড়ি তৈরি করতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। জটিল নকশার বিশেষ শাড়ির ক্ষেত্রে সময় লাগে কয়েক মাস পর্যন্ত। একটি সামান্য ভুলও নষ্ট করে দিতে পারে দীর্ঘদিনের শ্রম। অথচ সেই শ্রমের বিপরীতে তাঁতিরা কতটুকু পারিশ্রমিক পান, তা তাঁদের জীবনযাপনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়।
তাঁতশ্রমিক আহাম্মদ আলীর অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তিনি জানান, আগে সপ্তাহে তিনটি শাড়ি তৈরি করতেন, এখন সপ্তাহে চারটি তৈরি করেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষিকাজে এক দিনের শ্রমের জন্য যেখানে ৭০০/৮০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়, সেখানে তাঁতশ্রমিকদের পরিশ্রমের তুলনায় মজুরি কম। তাই নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই কাজে আসতে আগ্রহী নয়। আনোয়ারের মতো শ্রমিকদের প্রত্যাশা, তাঁদের মজুরি এমন পর্যায়ে উন্নীত হোক, যাতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোর পরও কিছু সঞ্চয় করা সম্ভব হয়।
রমেশ চন্দ্রের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। ২৩ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শাড়ি তৈরির জন্য মজুরি পান ৬০০/৭০০ টাকা। সপ্তাহে পাঁচটি শাড়ি তৈরি করেও সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু পেশা ছেড়ে যেতে পারেননি। কারণ, এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর পরিবারের ইতিহাস, দীর্ঘদিনের অভ্যাস এবং অর্জিত দক্ষতা। অন্য পেশায় গেলে নতুন করে শুরু করতে হবে সবকিছু। বয়স, আর্থিক সামর্থ্য এবং বিকল্প কাজের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক তাঁতির জন্য পেশা পরিবর্তনও সহজ নয়।
এই মানুষগুলোর সংকট শুধু কম মজুরির নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। যে দক্ষতা অর্জন করতে একজন মানুষের জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়, সেই দক্ষতার ন্যায্য মূল্য না পেলে শিল্পের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্ম যখন দেখে, বাবা-মা সারা দিন পরিশ্রম করেও সংসারের খরচ মেটাতে পারছেন না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে তাঁতশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ কারিগরি জ্ঞান, নকশা ও বুননের কৌশল।
এ সংকটের আরেকটি বড় কারণ কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি। তাঁতিদের সুতা, রং এবং অন্যান্য উপকরণ কিনতে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে যে শাড়ি তৈরিতে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে খরচ ৭০০/৮০০ টাকার বেশি। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়লেই বাজারে একই হারে দাম বাড়ানো যায় না। কারণ, ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দাম বাড়ালে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, আর দাম না বাড়ালে মুনাফা কমে যায়। এই দুই চাপের মাঝখানে পড়ে ক্ষুদ্র তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
সাধারণ ক্রেতাদের অবস্থাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সংসারের ব্যয় বেড়ে গেলে শাড়ির মতো পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত অনেক পরিবার পিছিয়ে দেয়। উৎসবের সময় কিছুটা বিক্রি বাড়লেও সারা বছর একই রকম চাহিদা থাকে না। ঈদ, দুর্গাপূজা ও পয়লা বৈশাখে শাড়ি কেনার আগ্রহ বাড়ে, কিন্তু অন্য সময়ে বাজার তুলনামূলক স্থবির থাকে। ফলে তাঁতিদের আয়ও অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। নকশা, সুতা, বুননের জটিলতা ও মানভেদে দামের পার্থক্য তৈরি হয়। কিন্তু বাজারে হাতে বোনা শাড়ির সঙ্গে পাওয়ারলুমে তৈরি শাড়ির প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। যন্ত্রে তুলনামূলক কম সময়ে বেশি কাপড় উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদনের পরিমাণ ও খরচের দিক থেকে এই প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র তাঁতিরা পিছিয়ে পড়েন। অনেক ক্রেতা হাতে বোনা শাড়ির বিশেষত্ব সম্পর্কে জানেন না; আবার অনেকে একই ধরনের নকশার কম দামের শাড়ি বেছে নেন।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যন্ত্রের ব্যবহার নিজেই সমস্যা নয়। আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদন বাড়াতে পারে, বিপণন সহজ করতে পারে এবং নতুন নকশা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু হাতে বোনা শাড়ির যে স্বাতন্ত্র্য, ঐতিহ্য ও কারিগরি মূল্য রয়েছে, তা যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারলে এই শিল্পের বিশেষত্ব বাজারে হারিয়ে যেতে পারে। হাতে বোনা শাড়ি এবং যন্ত্রে তৈরি শাড়ির পরিচয়, মান ও উৎপাদনপদ্ধতি সম্পর্কে ক্রেতাদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। এতে ক্রেতারা সচেতনভাবে পণ্য বেছে নিতে পারবেন, আর দক্ষ তাঁতিরাও তাঁদের কাজের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার শাড়ির ব্যবসা হয় এই অঞ্চলে। তবে করোনা মহামারির সময় থেকে ব্যবসায় মন্দা তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মূলধনের অভাব, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের সমস্যা, নকশা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি এবং বিপণনসংক্রান্ত জটিলতা শিল্পটিকে চাপে ফেলেছে। এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প শুধু ঐতিহ্যবাহী পেশা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যার সঙ্গে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও স্থানীয় বাজারের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এই শিল্পের সম্ভাবনার জায়গাও রয়েছে। শাড়ি ডিজাইনার ও ব্যবসায়ী নীল কমল বসাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, সৌদি আরব এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির চাহিদা রয়েছে। বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও হাতে তৈরি পণ্যের প্রতি আগ্রহী ক্রেতাদের কাছেও এই শাড়ি পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু শাড়ি তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক নকশা, বাজার গবেষণা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন কৌশল।
দেশের ভেতরেও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের পোশাকের রুচি, রং ও নকশার পছন্দ বুঝে নতুন সংগ্রহ তৈরি করা যেতে পারে। অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে তাঁতিরা সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং উৎপাদক পর্যায়ে বেশি অর্থ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অনলাইনে পণ্য বিক্রির জন্য ছবি, পণ্যের বিবরণ, মূল্য, সরবরাহ ও ফেরতসংক্রান্ত নিয়মে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। ছোট উদ্যোক্তাদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া গেলে তারা নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
টাঙ্গাইলের করটিয়া হাট এই শিল্পের বিপণনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারেরা এখানে আসেন। তাঁতিদের তৈরি কাপড় কিনে তাঁরা বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহ করেন। এই হাটের কার্যক্রম সচল রাখা এবং বাজারের সঙ্গে উৎপাদকদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শাড়ির নকশা, উৎপাদন ব্যয়, চাহিদা ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করে তাঁতিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে তাঁরা বাজার বুঝে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এতে অবিক্রীত পণ্যের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক জানিয়েছেন, তাঁতের শাড়ির প্রচার ও প্রসারে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। জেলা কারাগারে তাঁত বুননের যন্ত্র স্থাপন করে কয়েদিদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে মুক্তির পর তাঁরা এ পেশার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। এ উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে তাঁতশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ, উপকরণ সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পসুদে ঋণ, সহজ শর্তে মূলধন, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র তাঁতিদের জন্য যৌথভাবে সুতা ও অন্যান্য উপকরণ কেনার ব্যবস্থা করলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নকশাবিদ, প্রশিক্ষক, বিপণন বিশেষজ্ঞ এবং তাঁতিদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে মান যাচাই, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সহায়তা করা গেলে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো সহজ হবে।
তবে সহায়তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করাও জরুরি। কতজন তাঁতি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, কতটি তাঁত চালু রয়েছে, কতজন শ্রমিক মজুরিভিত্তিক কাজ করেন এবং কতজন ব্যবসায়ী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কারিগরদের কাছে সহায়তা পৌঁছাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন। শুধু প্রদর্শনী বা উৎসবকেন্দ্রিক প্রচার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না; তাঁতিদের নিয়মিত আয় নিশ্চিত করাই হতে হবে প্রধান লক্ষ্য।
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প বাঁচানোর আলোচনা তাই কেবল একটি ঐতিহ্য রক্ষার আলোচনা নয়। এটি শ্রমের ন্যায্য মূল্য, পারিবারিক জীবিকার নিরাপত্তা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। একটি শাড়ি যখন বিদেশের কোনো দোকানে পৌঁছায়, তখন তার সঙ্গে পৌঁছে যায় টাঙ্গাইলের পরিচয়। কিন্তু সেই শাড়ি তৈরির কারিগর যদি নিজের সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে না পারেন, তবে ঐতিহ্যের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমরা উৎসবে টাঙ্গাইলের শাড়ি পরি, উপহার দিই, এর নকশার প্রশংসা করি। কিন্তু সেই শাড়ি তৈরির পেছনে থাকা মানুষের জীবন নিয়ে কতটা ভাবি? একটি শাড়ির মূল্য নির্ধারণের সময় তার সুতা ও নকশার হিসাব করা হয়; কিন্তু কারিগরের সময়, দক্ষতা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য কি সব সময় বিবেচনায় আসে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।
টাঙ্গাইলের তাঁতিরা করুণা চান না, চান তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য। তাঁরা চান, তাঁদের সন্তান যেন অভাবের কারণে বাপ-দাদার পেশাকে ঘৃণা করতে না শেখে; বরং গর্বের সঙ্গে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারে। চান, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা যেন হারিয়ে না যায়। আর চান, বিদেশে টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা বাড়লে তার সুফল যেন শুধু ব্যবসার পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থাকে, পৌঁছে যায় তাঁতের সামনে বসে থাকা মানুষের ঘরেও।
টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লির খটখট শব্দ থেমে গেলে শুধু কিছু তাঁত বন্ধ হবে না; নীরব হয়ে পড়বে বহু পরিবারের জীবিকার উৎস, হারিয়ে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মে গড়ে ওঠা কারিগরি জ্ঞান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তাঁতিদের একার নয়। সরকার, ব্যবসায়ী, নকশাবিদ, ক্রেতা এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্ভব ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি করা।
মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হাতে বোনা শাড়ি হয়তো উৎপাদনের গতিতে এগিয়ে থাকতে পারবে না। কিন্তু তার নিজস্বতা, কারিগরের মমতা ও ঐতিহ্যের মূল্য অন্যভাবে বিচার করার সুযোগ রয়েছে। সেই মূল্যকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে বাজারে, নীতিনির্ধারণে এবং আমাদের ভোক্তাচিন্তায়। কারণ, টাঙ্গাইলের শাড়ি শুধু একটি পণ্য নয় এটি হাজারো মানুষের শ্রমে বোনা জীবনকথা। সেই জীবনকথা যেন অভাব আর অনিশ্চয়তার ভারে একদিন হারিয়ে না যায়, এখনই তার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ