মৃত্যুদণ্ড কি অপরাধ কমাতে পারে?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তিগুলোর একটি হলো, কঠোরতম শাস্তির ভয় মানুষকে ভয়াবহ অপরাধ থেকে বিরত রাখবে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধের প্রশ্নটি এত সরল নয়। অপরাধের পেছনে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানসিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য কিংবা অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাসহ নানা কারণ কাজ করতে পারে।
শুধু শাস্তির কঠোরতা বাড়ালেই অপরাধ কমে যাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অপরাধ প্রতিরোধে অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীর শনাক্তকরণ, কার্যকর বিচার, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সম্ভাব্য অপরাধের আগাম প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদি একজন অপরাধী মনে করেন, অপরাধ করেও তিনি সহজেই পার পেয়ে যাবেন, তাহলে কাগজে লেখা সর্বোচ্চ শাস্তি তাঁকে কতটা নিবৃত্ত করবে? অন্যদিকে, তদন্ত ও বিচারব্যবস্থা কার্যকর হলে অপরাধীর দায় এড়ানোর সুযোগ কমে আসে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের ওপর নির্ভর না করে অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাও জরুরি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি দেওয়া নয়; অপরাধের শিকার হওয়ার আগেই মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। নারী ও শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ, দুর্নীতি কিংবা হত্যাকাণ্ড যে ক্ষেত্রেই হোক, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।
মানবাধিকারের ধারণাটি সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে তখনই, যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘৃণ্য কোনো অপরাধে জড়িত বলে বিবেচিত হন। যাঁর বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাঁর অধিকার রক্ষার কথা শুনতে অনেকেরই আপত্তি হতে পারে। কেউ বলতে পারেন, অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়া ব্যক্তির নিজের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে আবার প্রশ্ন কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে মানবাধিকারের মূল দর্শনে। মানবাধিকার কোনো পুরস্কার নয়, যা ভালো আচরণের বিনিময়ে দেওয়া হবে। এটি মানুষের মৌলিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন ব্যক্তি অপরাধ করলে তাঁর স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, আইন অনুযায়ী তাঁকে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাঁর মানবিক মর্যাদা সম্পূর্ণ অস্বীকার করাই কি ন্যায়বিচারের লক্ষ্য হওয়া উচিত?
মানবাধিকার রক্ষার অর্থ অপরাধীকে দায়মুক্তি দেওয়া নয়। বরং অপরাধের বিচার এমনভাবে নিশ্চিত করা, যাতে আইনের শাসন অক্ষুণ্ন থাকে এবং রাষ্ট্র নিজেও মানবাধিকারের সীমা অতিক্রম না করে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার নাগরিকদের সঙ্গে আচরণে নয়, সবচেয়ে দুর্বল, অজনপ্রিয় কিংবা ঘৃণিত মানুষের প্রতিও তার বিচারব্যবস্থা কতটা ন্যায়সংগত, তা দিয়েও নির্ধারিত হয়। কারণ আজ যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, কাল অন্য কেউ একই ব্যবস্থার ভুলের শিকার হতে পারেন। আইনের সুরক্ষা সবার জন্য সমান হওয়া তাই অপরিহার্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার ও আইনগত অবস্থান এক নয়। অনেক দেশ সব ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। কিছু দেশে সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে এটি বিলোপ করা হলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছে। আবার কিছু দেশে আইনত মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে, যদিও দীর্ঘদিন তা কার্যকর করা হয় না। অন্য কয়েকটি দেশে নিয়মিতভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ও কার্যকর করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে জীবনের অধিকার ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর শাস্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ক্ষেত্রে দেশগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা এক নয়; সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তিতে কোনো রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও তার আইনি অবস্থান বিবেচনা করতে হয়।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা কতটা মানবিক, তা নিয়ে আলোচনা করা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ নয়। এটি মানুষের জীবন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আলোচনা।
বাংলাদেশেও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রচলিত আইনে বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। হত্যাকাণ্ডসহ ভয়াবহ অপরাধের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জনপরিসরে প্রায়ই ওঠে। অপরাধের শিকার পরিবারগুলো ন্যায়বিচার চান, সমাজ চায় নিরাপত্তা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধ দমন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
কিন্তু একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, তদন্তের মান, সাক্ষীর নিরাপত্তা, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর দায় নির্ধারণ করতে হয়।
বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের পক্ষে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করা বা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় আইনগত সহায়তা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর আপিলব্যবস্থা ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের অপরাধের বাস্তবতা কিংবা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে, কীভাবে অপরাধীর যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুল বিচারের ঝুঁকি কমানো যায়, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কে তথ্য, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে সামনে রাখা প্রয়োজন। আবেগের তীব্র মুহূর্তেও রাষ্ট্রের বিচারিক সিদ্ধান্ত যেন প্রতিশোধের ভাষায় পরিচালিত না হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস আমাদের এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করায়, যা সহজে মেনে নেওয়া যায় না কখনো কখনো ন্যায়বিচারের নামে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার ভুল আর কখনো সংশোধন করা সম্ভব নয়।
একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর কারাগারের দরজা আবার খুলতে পারে, আদালতের নথি সংশোধিত হতে পারে, নতুন তদন্তে সত্য প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু যাঁর জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তিনি আর ফিরে আসবেন না। তাঁর সন্তান বাবাকে ফিরে পাবে না, তাঁর মা সন্তানের মুখ দেখতে পাবেন না, তাঁর পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও থাকবে না।
অবশ্যই অপরাধের শিকার মানুষের কান্না, হারানো জীবনের শূন্যতা এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। তাঁদের বেদনা ভুলে গিয়ে মানবাধিকারের কথা বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি সেই বেদনার জবাবে আরেকটি জীবন কেড়ে নেওয়াকেই ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ মনে করাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
আমাদের এমন একটি বিচারব্যবস্থা দরকার, যেখানে অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবেন না, নিরপরাধ মানুষ ভুল বিচারের শিকার হবেন না এবং ভুক্তভোগীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে এমন একটি সমাজ প্রয়োজন, যেখানে অপরাধ প্রতিরোধ, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে অপরাধের পক্ষে দাঁড়ানো নয়। এটি এমন এক ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো, যেখানে শাস্তি থাকবে, জবাবদিহি থাকবে, ভুক্তভোগীর অধিকার থাকবে কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও থাকবে।
১০ অক্টোবর তাই শুধু একটি দিবস নয়; এটি আমাদের বিবেকের কাছে রাখা একটি আবেদন। আমরা কি এমন পৃথিবী চাই, যেখানে প্রতিটি ভয়াবহ অপরাধের উত্তর আরেকটি মৃত্যুর মধ্যেই খোঁজা হবে? নাকি এমন পৃথিবী গড়তে চাই, যেখানে অপরাধের বিচার হবে, মানুষ নিরাপদ থাকবে এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি হবে মানবিক মর্যাদা?
মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবসে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু একটি প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব। আর যে ন্যায়বিচার ভুল স্বীকার করার সুযোগ রাখে না, তার সামনে মানবিকতার প্রশ্ন তোলা কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ