মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে ছবি আঁকতে পারে এআই!

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

এক ঘণ্টার স্ক্যানেই নতুন ব্যক্তির মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণের সক্ষমতা; স্বপ্নের দৃশ্য পুনর্গঠনের সম্ভাবনা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন।
মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে সে যে দৃশ্য দেখছে, তার ছবি পুনর্গঠন করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গবেষকেরা। ব্রেইন-আইটি  নামের এই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের সংকেত থেকে দৃশ্যের মূল বিষয়বস্তুর পাশাপাশি বস্তুগুলোর অবস্থান, আকার, রং ও গঠনও তুলনামূলক নির্ভুলভাবে পুনর্গঠন করতে পারে। গবেষকদের দাবি, নতুন কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে প্রযুক্তিটিকে খাপ খাইয়ে নিতে প্রায় এক ঘণ্টার স্ক্যানের তথ্যই যথেষ্ট হতে পারে। এর আগে একই ধরনের অনেক পদ্ধতিতে তুলনামূলক ভালো ফল পেতে প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর্যন্ত মস্তিষ্কের স্ক্যানের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। প্রযুক্তিটির এই অগ্রগতি মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ, দৃশ্য শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এটি এখনো মানুষের সব চিন্তা, স্মৃতি কিংবা স্বপ্ন সরাসরি পড়ে ফেলার প্রযুক্তি নয়।

ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক মিকাল ইরানির নেতৃত্বে গবেষক দলটি এ প্রযুক্তি তৈরি করেছে। গবেষক দলে আরও রয়েছেন রোমান বেলি, আমিত জালচার, জোনাথন কগম্যান ও নাভে ওয়াসারম্যান। তাঁদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির গবেষণাপত্র ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন লার্নিং রিপ্রেজেন্টেশনস বা আইসিএলআরে উপস্থাপনের জন্য গৃহীত হয়েছে। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কে দৃশ্য দেখার সময় যে স্নায়বিক কার্যকলাপ ঘটে, সেখান থেকে দৃশ্যের বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে কম্পিউটারের মাধ্যমে তার কাছাকাছি একটি ছবি তৈরি করা। এই প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, মানুষ কোনো দৃশ্য দেখার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে। চোখের মাধ্যমে পাওয়া আলোকসংকেত স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্যে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এরপর মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল দৃশ্যের রং, আকার, অবস্থান, গভীরতা এবং অর্থবহ বৈশিষ্ট্য প্রক্রিয়াকরণে অংশ নেয়। একজন মানুষ যখন একটি বাড়ি, গাছ, প্রাণী কিংবা মানুষের মুখ দেখে, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট ধরনের কার্যকলাপ তৈরি হয়। এই কার্যকলাপের ধরন বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা বোঝার চেষ্টা করেন, মানুষটি কী দেখছে।
ব্রেইন-আইটি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয় কার্যকর চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রায়ণ বা এফএমআরআই। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে রক্তপ্রবাহ ও অক্সিজেনের মাত্রার পরিবর্তন পরিমাপ করা হয়। কারণ, স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ বাড়লে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে রক্তপ্রবাহের ধরনও পরিবর্তিত হতে পারে। এফএমআরআই সরাসরি চিন্তা বা স্মৃতি রেকর্ড করে না; বরং মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের ছবি তৈরি করে।
এআই মডেল এসব তথ্যের মধ্যে থাকা নির্দিষ্ট ধরন শনাক্ত করে। এরপর সেই ধরন থেকে দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুমান করা হয়। যেমন, ছবিতে কোনো ব্যক্তি আছে কি না, বস্তুটি কোথায় রয়েছে, দৃশ্যটি ঘরের ভেতরের নাকি বাইরের, কিংবা ছবির কোন অংশে নির্দিষ্ট রং রয়েছে এসব বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের কাজে লাগানো হয়। সব তথ্য একত্র করে এআই একটি নতুন ছবি তৈরি করে, যা মানুষের দেখা মূল দৃশ্যের সঙ্গে যতটা সম্ভব সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়।মস্তিষ্কের সংকেত থেকে ছবি তৈরি করার গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। গত কয়েক বছরে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগের অনেক এআই মডেল মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা দিতে পারত। যেমন, কোনো ব্যক্তি প্রাণী, গাড়ি কিংবা মানুষের মুখ দেখছেন এ ধরনের বিষয় শনাক্ত করা সম্ভব হতো। কিন্তু পুনর্গঠিত ছবিতে মূল দৃশ্যের অবস্থান, আকার, রঙ এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য অনেক সময় বদলে যেত।
ব্রেইন-আইটির বিশেষত্ব হলো, এটি দৃশ্যের অর্থ বোঝার পাশাপাশি ছবির গঠনগত বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠনের ওপরও গুরুত্ব দেয়। গবেষণায় এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের সঙ্গে ছবির বিভিন্ন অংশের সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়। ফলে শুধু ছবির বিষয়বস্তু নয়, সেই বিষয়বস্তু ছবির কোথায় রয়েছে এবং অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী সেসব তথ্যও কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
অধ্যাপক মিকাল ইরানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের মডেলগুলো অনেক সময় ছবির সামগ্রিক অর্থ ঠিক রাখতে পারলেও গঠন ও রঙের মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্যে ভুল করত। ব্রেইন-আইটি এই সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। গবেষকদের পরীক্ষায় এটি আগের কয়েকটি পদ্ধতির তুলনায় উন্নত পুনর্গঠন দেখিয়েছে। তবে তুলনামূলক উন্নত ফল পাওয়া মানেই প্রতিটি ছবি হুবহু পুনরায় তৈরি করা সম্ভব এমন নয়।এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের খরচ ও সময়। একটি এআই মডেলকে মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত থেকে ছবি তৈরি করতে শেখানোর জন্য সাধারণত অনেক ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের স্ক্যানের তথ্য প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যখন একটি নির্দিষ্ট ছবি দেখেন, তখন তাঁর মস্তিষ্কের কার্যকলাপের যে ধরন তৈরি হয়, সেটিকে সংশ্লিষ্ট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়।
এ জন্য অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্যানারের ভেতরে থাকতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয়। তাছাড়া একজন মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন অন্যজনের থেকে কিছুটা আলাদা হতে পারে। ফলে একজনের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত মডেল অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই রকম ফল দেবে, এমন নিশ্চয়তা থাকে না।
ব্রেইন-আইটির গবেষকেরা এই সমস্যার সমাধানে এমন একটি মডেল তৈরি করেছেন, যা বিভিন্ন মানুষের মস্তিষ্কে দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণের সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করতে পারে। তাঁদের প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, নতুন কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে মাত্র এক ঘণ্টার এফএমআরআই তথ্য ব্যবহার করে এমন পুনর্গঠন পাওয়া সম্ভব হয়েছে, যা আগের পদ্ধতিগুলোর প্রায় ৪০ ঘণ্টার তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত মডেলের ফলের সঙ্গে তুলনীয়।
এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভবিষ্যতে গবেষণাগারে নতুন অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে পরীক্ষা চালানোর সময় কমতে পারে। তবে এক ঘণ্টার স্ক্যানের অর্থ এই নয় যে পুরো প্রযুক্তি তৈরি, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য মোট সময়ও মাত্র এক ঘণ্টা লাগে। এটি মূলত নতুন ব্যক্তির মস্তিষ্কের তথ্যের সঙ্গে মডেলকে খাপ খাওয়ানোর সময়সংক্রান্ত দাবি।
১২৮টি কার্যকর অঞ্চলের রহস্য
ব্রেইন-আইটির উন্নয়নে গবেষকেরা একটি সর্বজনীন মস্তিষ্ক-এনকোডার ব্যবহার করেছেন। এনকোডার হলো এমন একটি মডেল, যা কোনো ছবির বৈশিষ্ট্য থেকে মস্তিষ্কে কী ধরনের কার্যকলাপ দেখা যেতে পারে, তা অনুমান করতে শেখে। অন্যদিকে ডিকোডার মস্তিষ্কের কার্যকলাপের তথ্য থেকে ছবির বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করার চেষ্টা করে।
দুই ধরনের মডেলকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা তথ্যের ঘাটতি মোকাবিলা করেছেন। তাঁরা এমন ছবিও ব্যবহার করতে পেরেছেন, যেগুলো দেখার সময় বাস্তবে কোনো ব্যক্তির এফএমআরআই স্ক্যান নেওয়া হয়নি। এনকোডার এসব ছবির জন্য সম্ভাব্য মস্তিষ্ক-সংকেতের একটি অনুমান তৈরি করে। পরে ডিকোডার সেই অনুমান থেকে ছবিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। এভাবে ছবি ও মস্তিষ্কের সংকেতের মধ্যে সম্পর্ক শেখার জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ-উপাত্ত তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষকেরা মস্তিষ্কের প্রায় ৪০ হাজার ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক একক বা ভক্সেলের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে ১২৮টি কার্যগত গুচ্ছ শনাক্ত করেছেন। এসব গুচ্ছ বিভিন্ন মানুষের মস্তিষ্কে দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যকলাপের মিল খুঁজে পেতে সহায়তা করে। এখানে ১২৮টি অঞ্চল বলতে মস্তিষ্কের ১২৮টি আলাদা শারীরিক অংশ বোঝানো হচ্ছে না; বরং বিভিন্ন মানুষের মস্তিষ্কে কার্যগতভাবে মিল রয়েছে এমন সংকেতের গুচ্ছ বোঝানো হয়েছে।
এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে। মস্তিষ্কের কোন অঞ্চল রং, স্থান কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণে ভূমিকা রাখে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও গবেষকেরা নতুন সূত্র পেয়েছেন। ফলে প্রযুক্তিটি শুধু ছবি পুনর্গঠনের জন্য নয়, মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে দৃশ্য বোঝে, সে বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।ব্রেইন-আইটি নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি দিয়ে স্বপ্নের ছবি পুনর্গঠন করা যাবে কি না। মানুষ ঘুমের মধ্যে নানা দৃশ্য, ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের দৃশ্য দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং সেগুলো সব সময় স্পষ্ট বা ধারাবাহিকও থাকে না।
এফএমআরআই স্ক্যানের সময়গত সীমাবদ্ধতা এখানে বড় বাধা। একটি স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য পেতে প্রায় দুই সেকেন্ড সময় লাগতে পারে। অথচ একটি ভিডিওতে প্রতি সেকেন্ডে বহু দৃশ্য বা ফ্রেম বদলে যায়। ফলে চলমান দৃশ্যের প্রতিটি মুহূর্তকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা এবং সেগুলোকে ধারাবাহিকভাবে পুনর্গঠন করা কঠিন।
অধ্যাপক ইরানি জানিয়েছেন, ভিডিওর মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য পুনর্গঠন করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে স্বপ্নের দৃশ্য বিশ্লেষণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে স্বপ্নের ছবি পুনর্গঠন এবং স্বপ্নের সম্পূর্ণ কাহিনি, অনুভূতি কিংবা অর্থ নির্ভুলভাবে উদ্ধার করা এক বিষয় নয়। এখনো স্বপ্নকে ভিডিওর মতো হুবহু পুনর্গঠন করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও সামনে আসছে। মস্তিষ্কের সংকেত থেকে দৃশ্য পুনর্গঠন সম্ভব হলে ভবিষ্যতে মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য জানা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে বর্তমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি করা ঠিক হবে না।
ব্রেইন-আইটি মূলত কোনো ব্যক্তি যখন নির্দিষ্ট দৃশ্য দেখেন, তখন তাঁর মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া সংকেত বিশ্লেষণ করে সেই দৃশ্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। এটি এমন কোনো যন্ত্র নয়, যা দূর থেকে একজন মানুষের মনের ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর সব চিন্তা পড়ে ফেলতে পারে। এর জন্য বিশেষায়িত স্ক্যানিং যন্ত্র, প্রশিক্ষিত এআই মডেল এবং উপযুক্ত তথ্য প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া মস্তিষ্কের সংকেত থেকে পাওয়া ফল সব সময় নির্ভুল নয়। একই ধরনের সংকেত থেকে কখনো একাধিক সম্ভাব্য দৃশ্যের ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পুনর্গঠিত ছবিতে কিছু বৈশিষ্ট্য সঠিক থাকলেও অন্য কিছু বৈশিষ্ট্য ভুল হতে পারে। ফলে শুধু এআইয়ের তৈরি ছবি দেখে কোনো ব্যক্তি কী ভেবেছেন বা কী স্মরণ করেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
তবু ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে মস্তিষ্কের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সম্মতি এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে চিকিৎসা, গবেষণা কিংবা যোগাযোগের কাজে মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করা হলে কে সেই তথ্য দেখতে পারবেন, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবেন এবং কত দিন সংরক্ষণ করা হবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে।
মস্তিষ্কের কার্যকলাপ থেকে দৃশ্য পুনর্গঠনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে দৃশ্যের অর্থ বোঝে, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আলাদা করে এবং স্মৃতি ও উপলব্ধির সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক তৈরি করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এ ধরনের মডেল সহায়ক হতে পারে।
মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের গবেষণাতেও এ প্রযুক্তির অগ্রগতি প্রাসঙ্গিক। গুরুতর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে যোগাযোগের উপায় তৈরির গবেষণা চলছে। তবে ব্রেইন-আইটির বর্তমান কাজ মূলত দেখা ছবি পুনর্গঠন নিয়ে; তাই এটিকে এখনই পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রস্তুত চিকিৎসা বা যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
একই সঙ্গে গবেষকেরা মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন শনাক্ত করার মাধ্যমে দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ধারণা পাওয়ার আশা করছেন। ভবিষ্যতে শ্রবণসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত দৃশ্য পুনর্গঠনের গবেষণাও এ ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে পারে। এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে আরও পরীক্ষা, স্বাধীন যাচাই এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ব্রেইন-আইটি মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা দৃশ্যের ছবি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশেষ করে নতুন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্যানের সময় কমিয়ে আনার বিষয়টি গবেষণাটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে প্রযুক্তিটির সাফল্যকে মানুষের মন পুরোপুরি পড়ে ফেলার সক্ষমতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি মস্তিষ্ক কীভাবে দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, সেই জটিল প্রক্রিয়া বোঝার একটি নতুন বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার যত বাড়বে, ততই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি ও নৈতিকতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
তথ্যসূত্র: ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের গবেষণা-প্রতিবেদন এবং ব্রেইন-আইটি গবেষণাপত্র।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

shafiqualalam@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ