বিশ্ব মান দিবস আজ

মানসম্মত পণ্য ও সেবাই হোক টেকসই উন্নয়ন ও ভোক্তার অধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

প্রতি বছর ১৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মান দিবস। আধুনিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তির বিকাশ এবং নিরাপদ ভোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মানের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি পণ্যের গুণগত মান, একটি সেবার নির্ভরযোগ্যতা কিংবা একটি প্রযুক্তির নিরাপত্তা সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ। আর এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা, মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেই বিশ্ব মান দিবসের আয়োজন।
বিশ্ব মান দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বিশ্বব্যাপী মান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক, শিল্পোদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবীদের অবদানের স্বীকৃতি জানানোর দিন। একই সঙ্গে উৎপাদক, ব্যবসায়ী, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। কারণ মানসম্মত পণ্য ও সেবা মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে, অপচয় কমায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে সুগম করে।
বিশ্ব মান দিবসের ইতিহাস আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মান প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও)। পরে ১৯৭০ সালে আইএসওর তৎকালীন সভাপতি ফারুক সুন্টার ১৪ অক্টোবরকে বিশ্ব মান দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেন। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
আইএসওর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) বিশ্বব্যাপী মান প্রণয়ন ও প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ফলে বিভিন্ন দেশের উৎপাদিত পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবার মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখন এক দেশের কাঁচামাল অন্য দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়, তৃতীয় দেশে যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এবং চতুর্থ দেশে চূড়ান্ত পণ্য বাজারজাত করা হয়, তখন অভিন্ন মানদণ্ড ছাড়া নিরাপদ ও কার্যকর উৎপাদনব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মান বলতে আমরা সাধারণত কোনো পণ্যের ভালো-মন্দ কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মান আরও ব্যাপক বিষয়। একটি পণ্য নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য পূরণ করছে কি না, সেটি নিরাপদ কি না, নির্ধারিত কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে পারছে কি না, দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য কি না এবং পরিবেশের ওপর অযাচিত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কি না এসব বিষয় মান নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে কোনো সেবার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা, নির্ভুলতা, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রাহকের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাও মানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মান নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্য ও সেবার জন্য এমন কিছু গ্রহণযোগ্য নিয়ম, বৈশিষ্ট্য ও পরীক্ষাপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা, যাতে উৎপাদক, বিক্রেতা, সেবাদানকারী এবং ভোক্তা সবাই একটি অভিন্ন ধারণার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমে, ভুলের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং পণ্য বা সেবার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানের অনুসরণ ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতেও সহায়তা করে।
মানের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য গ্রহণ করি, যে ওষুধ ব্যবহার করি, যে বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাই, যে যানবাহনে চলাচল করি কিংবা যে নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করি, সেগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মানের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যে ভেজাল, ওষুধের নিম্নমান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ত্রুটি কিংবা নির্মাণসামগ্রীর অনুপযুক্ত ব্যবহার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তাই মান নিশ্চিত করা নিছক ব্যবসায়িক দায়িত্ব নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্ব মান দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নয়। সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হয়, মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে মানদণ্ড তৈরি করতে হয়, উৎপাদককে সেই মান অনুসরণ করতে হয়, ব্যবসায়ীকে সঠিক তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হয় এবং ভোক্তাকে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে হয়। এই সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ছাড়া একটি কার্যকর মানব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
মানদণ্ড প্রণয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান সংস্থাগুলোর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইএসও বিভিন্ন শিল্প ও সেবাখাতে আন্তর্জাতিক মান তৈরি করে। যেমন, আইএসও ৯০০১ মান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত; এর লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকের চাহিদা ও প্রযোজ্য নিয়ম পূরণ করা যায়। অন্যদিকে আইএসও ১৪০০১ পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি আন্তর্জাতিক মান। এটি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত প্রভাব চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পরিবেশগত কর্মদক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের এসব সনদ থাকা মানেই তার প্রতিটি পণ্য শতভাগ ত্রুটিমুক্ত এমন নিশ্চয়তা নয়; সনদের পরিধি, বাস্তবায়ন এবং যাচাইপ্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসাসামগ্রী, তথ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নির্মাণপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগব্যবস্থায় মানদণ্ডের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের যুগে তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও মানের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। একটি প্রযুক্তি তখনই মানুষের প্রকৃত কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যখন সেটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, ব্যবহারোপযোগী এবং দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হয়।
মানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোক্তার অধিকার। একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য কেনেন, তখন তিনি আশা করেন যে পণ্যটি ঘোষিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কাজ করবে, নির্ধারিত পরিমাণে থাকবে এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ঝুঁকি তৈরি করবে না। কিন্তু বাজারে নিম্নমানের পণ্য, ভুল লেবেল, পরিমাণে কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি কিংবা মান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থাকলে ভোক্তা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখেও পড়েন। তাই মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বাজার তদারকি, সঠিক তথ্য প্রকাশ, অভিযোগ গ্রহণ এবং কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানের প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন করলেই চলে না; পণ্যের নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আমদানিবিধি পূরণ করার সক্ষমতাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলে উৎপাদকের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে, ক্রেতার আস্থা তৈরি হয় এবং একই ধরনের পণ্য বারবার পরীক্ষা করার ব্যয় কিছু ক্ষেত্রে কমে। তবে মানদণ্ড পূরণ করলেই সব বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত হয় না; প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, পরীক্ষার শর্ত এবং সনদসংক্রান্ত বিধানও মেনে চলতে হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় মানসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা অপরিহার্য। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিকসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা, পণ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশগত বিধান এবং শ্রমিকের কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত শর্ত পূরণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বিএসটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পণ্যের জাতীয় মান প্রণয়ন, পরীক্ষণ, মানসনদ প্রদান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে মান নিশ্চিত করার সামগ্রিক দায়িত্ব শুধু বিএসটিআইয়ের নয়। খাদ্যনিরাপত্তা, ওষুধ, পরিবেশ, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ভোক্তা অধিকার এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত খাতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত বাজার তদারকি প্রয়োজন।
দেশে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের পথে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার কাছে আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং মান ব্যবস্থাপনা চালুর ব্যয় বহন করা কঠিন। কোথাও কোথাও মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আবার অসাধু ব্যবসায়ীর মুনাফাকেন্দ্রিক প্রবণতা, দুর্বল নজরদারি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি এবং ক্রেতার অসচেতনতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র, পেশাজীবী সংগঠন এবং ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে মান উন্নয়নের কাজে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে মান, পরীক্ষণ, পরিমাপবিজ্ঞান এবং গুণগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মী তৈরি, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ত্রুটি শনাক্তকরণ, যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানসংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ও উপযুক্ত স্বীকৃতির ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পণ্য কেনার সময় উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, উপাদান, ওজন, মূল্য, ব্যবহারবিধি, সতর্কীকরণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানচিহ্ন বা সনদের তথ্য যাচাই করা উচিত। তবে কোনো পণ্যে মানচিহ্ন দেখেই সব ধরনের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না; চিহ্নটি বৈধ কি না এবং পণ্যটির জন্য প্রযোজ্য কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। কোনো পণ্য সম্পর্কে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, ক্রয়রসিদ সংরক্ষণ এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন ভোক্তা শুধু নিজের অধিকার রক্ষা করেন না; তিনি বাজারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও মানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিম্নমানের পণ্য দ্রুত নষ্ট হলে তা পুনরায় কিনতে হয়, ফলে অর্থের অপচয় বাড়ে এবং বর্জ্যও সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী, মেরামতযোগ্য ও জ্বালানিসাশ্রয়ী পণ্য সম্পদের ব্যবহার কমাতে সহায়তা করতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে পরিবেশবান্ধব বলে কোনো পণ্যের দাবি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না; দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ও যথাযথ যাচাই থাকা জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং ডিজিটাল সেবার দ্রুত প্রসার মান ব্যবস্থাপনার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি যেন পরস্পরের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তথ্য যেন সুরক্ষিত থাকে এবং ডিজিটাল সেবা যেন নির্ভরযোগ্য হয়, তার জন্যও আন্তর্জাতিক মান প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতের মানব্যবস্থা তাই শুধু পণ্যের আকার, ওজন বা কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে নৈতিকতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি আমাদের উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। উন্নয়ন শুধু বেশি পণ্য উৎপাদন কিংবা বেশি মুনাফা অর্জনের নাম নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন উৎপাদিত পণ্য মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে, সেবা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, ব্যবসা আস্থা সৃষ্টি করে এবং শিল্পায়ন পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বশীল থাকে। মানহীন উন্নয়ন সাময়িক লাভ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশ্ব মান দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত পণ্য ও সেবার মানকে অতিরিক্ত ব্যয় নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা। সরকারকে মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে, উৎপাদককে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে, ব্যবসায়ীকে ভোক্তার আস্থার মর্যাদা দিতে হবে এবং নাগরিককে সচেতন হতে হবে। মানসংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মান সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
মানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে বাজারে প্রতারণা কমবে, উৎপাদনে অপচয় হ্রাস পাবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন হবে আরও নিরাপদ। বিশ্ব মান দিবস তাই শুধু একটি তারিখের স্মারক নয়; এটি দায়িত্বশীল উৎপাদন, ন্যায়সংগত ব্যবসা, সচেতন ভোগ এবং মানবকল্যাণমুখী উন্নয়নের সম্মিলিত আহ্বান। মানসম্মত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আস্থার অর্থনীতি, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
শফিকুল আলম সেলিম
প্রতি বছর ১৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মান দিবস। আধুনিক পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তির বিকাশ এবং নিরাপদ ভোগব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মানের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি পণ্যের গুণগত মান, একটি সেবার নির্ভরযোগ্যতা কিংবা একটি প্রযুক্তির নিরাপত্তা সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ। আর এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা, মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেই বিশ্ব মান দিবসের আয়োজন।
বিশ্ব মান দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বিশ্বব্যাপী মান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক, শিল্পোদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবীদের অবদানের স্বীকৃতি জানানোর দিন। একই সঙ্গে উৎপাদক, ব্যবসায়ী, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। কারণ মানসম্মত পণ্য ও সেবা মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে, অপচয় কমায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে সুগম করে।
বিশ্ব মান দিবসের ইতিহাস আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মান প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক মান সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (আইএসও)। পরে ১৯৭০ সালে আইএসওর তৎকালীন সভাপতি ফারুক সুন্টার ১৪ অক্টোবরকে বিশ্ব মান দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেন। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
আইএসওর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি) এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) বিশ্বব্যাপী মান প্রণয়ন ও প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের ফলে বিভিন্ন দেশের উৎপাদিত পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবার মধ্যে সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যখন এক দেশের কাঁচামাল অন্য দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়, তৃতীয় দেশে যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এবং চতুর্থ দেশে চূড়ান্ত পণ্য বাজারজাত করা হয়, তখন অভিন্ন মানদণ্ড ছাড়া নিরাপদ ও কার্যকর উৎপাদনব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মান বলতে আমরা সাধারণত কোনো পণ্যের ভালো-মন্দ কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বুঝি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মান আরও ব্যাপক বিষয়। একটি পণ্য নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য পূরণ করছে কি না, সেটি নিরাপদ কি না, নির্ধারিত কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে পারছে কি না, দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য কি না এবং পরিবেশের ওপর অযাচিত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কি না এসব বিষয় মান নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে কোনো সেবার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা, নির্ভুলতা, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রাহকের প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতাও মানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মান নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো পণ্য ও সেবার জন্য এমন কিছু গ্রহণযোগ্য নিয়ম, বৈশিষ্ট্য ও পরীক্ষাপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা, যাতে উৎপাদক, বিক্রেতা, সেবাদানকারী এবং ভোক্তা সবাই একটি অভিন্ন ধারণার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা কমে, ভুলের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং পণ্য বা সেবার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানের অনুসরণ ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতেও সহায়তা করে।
মানের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য গ্রহণ করি, যে ওষুধ ব্যবহার করি, যে বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালাই, যে যানবাহনে চলাচল করি কিংবা যে নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করি, সেগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মানের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যে ভেজাল, ওষুধের নিম্নমান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ত্রুটি কিংবা নির্মাণসামগ্রীর অনুপযুক্ত ব্যবহার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। তাই মান নিশ্চিত করা নিছক ব্যবসায়িক দায়িত্ব নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্ব মান দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নয়। সরকারকে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হয়, মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে মানদণ্ড তৈরি করতে হয়, উৎপাদককে সেই মান অনুসরণ করতে হয়, ব্যবসায়ীকে সঠিক তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হয় এবং ভোক্তাকে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে হয়। এই সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ছাড়া একটি কার্যকর মানব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
মানদণ্ড প্রণয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান সংস্থাগুলোর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইএসও বিভিন্ন শিল্প ও সেবাখাতে আন্তর্জাতিক মান তৈরি করে। যেমন, আইএসও ৯০০১ মান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত; এর লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকের চাহিদা ও প্রযোজ্য নিয়ম পূরণ করা যায়। অন্যদিকে আইএসও ১৪০০১ পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি আন্তর্জাতিক মান। এটি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত প্রভাব চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পরিবেশগত কর্মদক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের এসব সনদ থাকা মানেই তার প্রতিটি পণ্য শতভাগ ত্রুটিমুক্ত এমন নিশ্চয়তা নয়; সনদের পরিধি, বাস্তবায়ন এবং যাচাইপ্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে খাদ্যনিরাপত্তা, চিকিৎসাসামগ্রী, তথ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি দক্ষতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নির্মাণপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগব্যবস্থায় মানদণ্ডের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের যুগে তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও মানের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। একটি প্রযুক্তি তখনই মানুষের প্রকৃত কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যখন সেটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, ব্যবহারোপযোগী এবং দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হয়।
মানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোক্তার অধিকার। একজন ক্রেতা যখন কোনো পণ্য কেনেন, তখন তিনি আশা করেন যে পণ্যটি ঘোষিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কাজ করবে, নির্ধারিত পরিমাণে থাকবে এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ঝুঁকি তৈরি করবে না। কিন্তু বাজারে নিম্নমানের পণ্য, ভুল লেবেল, পরিমাণে কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি কিংবা মান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থাকলে ভোক্তা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখেও পড়েন। তাই মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে বাজার তদারকি, সঠিক তথ্য প্রকাশ, অভিযোগ গ্রহণ এবং কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানের প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন করলেই চলে না; পণ্যের নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আমদানিবিধি পূরণ করার সক্ষমতাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলে উৎপাদকের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে, ক্রেতার আস্থা তৈরি হয় এবং একই ধরনের পণ্য বারবার পরীক্ষা করার ব্যয় কিছু ক্ষেত্রে কমে। তবে মানদণ্ড পূরণ করলেই সব বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত হয় না; প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, পরীক্ষার শর্ত এবং সনদসংক্রান্ত বিধানও মেনে চলতে হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় মানসম্মত উৎপাদনব্যবস্থা অপরিহার্য। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিকসামগ্রী, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা, পণ্যের নিরাপত্তা, পরিবেশগত বিধান এবং শ্রমিকের কর্মপরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত শর্ত পূরণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বিএসটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পণ্যের জাতীয় মান প্রণয়ন, পরীক্ষণ, মানসনদ প্রদান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে মান নিশ্চিত করার সামগ্রিক দায়িত্ব শুধু বিএসটিআইয়ের নয়। খাদ্যনিরাপত্তা, ওষুধ, পরিবেশ, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ভোক্তা অধিকার এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত খাতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত বাজার তদারকি প্রয়োজন।
দেশে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের পথে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার কাছে আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং মান ব্যবস্থাপনা চালুর ব্যয় বহন করা কঠিন। কোথাও কোথাও মান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আবার অসাধু ব্যবসায়ীর মুনাফাকেন্দ্রিক প্রবণতা, দুর্বল নজরদারি, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি এবং ক্রেতার অসচেতনতা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাকেন্দ্র, পেশাজীবী সংগঠন এবং ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে মান উন্নয়নের কাজে যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে মান, পরীক্ষণ, পরিমাপবিজ্ঞান এবং গুণগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ কর্মী তৈরি, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার ত্রুটি শনাক্তকরণ, যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানসংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ও উপযুক্ত স্বীকৃতির ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভোক্তার ভূমিকাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পণ্য কেনার সময় উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, উপাদান, ওজন, মূল্য, ব্যবহারবিধি, সতর্কীকরণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মানচিহ্ন বা সনদের তথ্য যাচাই করা উচিত। তবে কোনো পণ্যে মানচিহ্ন দেখেই সব ধরনের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না; চিহ্নটি বৈধ কি না এবং পণ্যটির জন্য প্রযোজ্য কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। কোনো পণ্য সম্পর্কে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, ক্রয়রসিদ সংরক্ষণ এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন ভোক্তা শুধু নিজের অধিকার রক্ষা করেন না; তিনি বাজারে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও মানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিম্নমানের পণ্য দ্রুত নষ্ট হলে তা পুনরায় কিনতে হয়, ফলে অর্থের অপচয় বাড়ে এবং বর্জ্যও সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী, মেরামতযোগ্য ও জ্বালানিসাশ্রয়ী পণ্য সম্পদের ব্যবহার কমাতে সহায়তা করতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে পরিবেশবান্ধব বলে কোনো পণ্যের দাবি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না; দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ও যথাযথ যাচাই থাকা জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন এবং ডিজিটাল সেবার দ্রুত প্রসার মান ব্যবস্থাপনার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি যেন পরস্পরের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তথ্য যেন সুরক্ষিত থাকে এবং ডিজিটাল সেবা যেন নির্ভরযোগ্য হয়, তার জন্যও আন্তর্জাতিক মান প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতের মানব্যবস্থা তাই শুধু পণ্যের আকার, ওজন বা কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে নৈতিকতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য এখানেই যে, এটি আমাদের উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। উন্নয়ন শুধু বেশি পণ্য উৎপাদন কিংবা বেশি মুনাফা অর্জনের নাম নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন উৎপাদিত পণ্য মানুষের জীবনকে নিরাপদ করে, সেবা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, ব্যবসা আস্থা সৃষ্টি করে এবং শিল্পায়ন পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বশীল থাকে। মানহীন উন্নয়ন সাময়িক লাভ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশ্ব মান দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত পণ্য ও সেবার মানকে অতিরিক্ত ব্যয় নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা। সরকারকে মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে, উৎপাদককে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে, ব্যবসায়ীকে ভোক্তার আস্থার মর্যাদা দিতে হবে এবং নাগরিককে সচেতন হতে হবে। মানসংক্রান্ত আইন ও বিধিবিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মান সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
মানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে বাজারে প্রতারণা কমবে, উৎপাদনে অপচয় হ্রাস পাবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন হবে আরও নিরাপদ। বিশ্ব মান দিবস তাই শুধু একটি তারিখের স্মারক নয়; এটি দায়িত্বশীল উৎপাদন, ন্যায়সংগত ব্যবসা, সচেতন ভোগ এবং মানবকল্যাণমুখী উন্নয়নের সম্মিলিত আহ্বান। মানসম্মত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আস্থার অর্থনীতি, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ