অভিযান চললেও থামছে না অবৈধ ব্যবসা, জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ
শফিকুল আলম সেলিম
মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার এবং মামলা দায়েরের মতো পদক্ষেপ চলমান থাকলেও মাদক কারবারের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ, তরুণদের মাদকের প্রতি আসক্তি এবং অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা জননিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, নিয়মিত অভিযান ও কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও মাদক কারবারের শিকড় উপড়ে ফেলা যাচ্ছে না কেন? অপরাধীদের একটি অংশ বারবার আইনের আওতায় এলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া যাচ্ছে না কেন?
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। পুলিশ, র্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্ট গার্ড এবং অন্যান্য সংস্থাও নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক প্রবেশ ঠেকানো থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে মজুত, পরিবহন ও বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এই কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতি, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে শনাক্ত করতে না পারার মতো সমস্যা কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে কিছু মাদক উদ্ধার ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও তাতেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। কোনো একটি চালান উদ্ধার বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার পর সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকলে নতুন ব্যক্তিরা একই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং মাদক কারবারের অর্থের উৎস, সরবরাহের নেটওয়ার্ক এবং অপরাধে সহায়তাকারীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জবাবদিহি নিয়ে। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে জানতে চাওয়া প্রয়োজন, অভিযোগগুলো কতটা যাচাই করা হয়েছে এবং কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া প্রশাসনের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ তোলা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা।
মাদক কারবারের সামাজিক প্রভাবও গভীর। মাদকের অপব্যবহার ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং পারিবারিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পরিবারে অশান্তি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও দেখা দিতে পারে। মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না পেলে সহজেই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু পুলিশের অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মাদকবিরোধী কার্যক্রম সফল করতে সীমান্ত নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের যথাযথ ব্যবহার, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং তদন্তের মান উন্নত করা প্রয়োজন। মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক লেনদেন ও অপরাধলব্ধ সম্পদের বিষয়ে আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমে বড় কারবারিদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানের ফলাফল, উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ, দায়ের করা মামলা এবং মামলার পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করলে জনসাধারণের আস্থা বাড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহের বশে হেনস্তা করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। আইন প্রয়োগের প্রতিটি ধাপে মানবাধিকার, নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং সামাজিকভাবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রসার এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো মাদক প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। মাদক ব্যবসায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এই দুটি কার্যক্রমকে আলাদা করে দেখতে হবে।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে মাদক নিয়ন্ত্রণে টেকনাফসহ ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত অভিযানের কথা তুলে ধরা হয়। অর্থাৎ, সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব সরকারি পর্যায়েও স্বীকৃত। কিন্তু এসব উদ্যোগের প্রকৃত কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হলে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়, মাদক সরবরাহ কমেছে কি না, বড় কারবারিরা বিচারের আওতায় এসেছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রশাসনকে অসহায় অবস্থায় থাকতে দেওয়া যায় না। আবার বাস্তব তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া পুরো প্রশাসনকে ব্যর্থ বা দায়ী বলাও সমীচীন নয়। প্রয়োজন কার্যকর নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত সক্ষমতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপমুক্ত আইন প্রয়োগ। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সাফল্য নির্ধারিত হবে না শুধু কতজন গ্রেপ্তার হলেন, তার ওপর। সাফল্য নির্ভর করবে অবৈধ সরবরাহ কতটা কমল, কারবারের মূল হোতারা কতটা বিচারের মুখোমুখি হলেন এবং নতুন প্রজন্মকে মাদকের ঝুঁকি থেকে কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল, তার ওপর। প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তা এবং সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায় অভিযান চলবে, মামলা হবে, গ্রেপ্তারও হবে কিন্তু মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাবে।