২২ অক্টোবর জন্ম দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী শহীদ আসফাকউল্লা খান

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে জন্মগ্রহণ করেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর বিপ্লবী শহীদ আসফাকউল্লা খান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। তাঁর জীবন ছিল দেশপ্রেম, সাহস, আত্মত্যাগ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পাঠান পরিবারে জন্ম নেওয়া আসফাকউল্লার বাবা শফিকউল্লা খান ছিলেন সামরিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ পরিবারের সদস্য। ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেমমূলক কবিতা ও সাহিত্য তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্কুলে পড়ার সময় ক্ষুদিরাম বসু ও কানাইলাল দত্তের আত্মত্যাগের কাহিনি শুনে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা পান। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

বিপ্লবী রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দুজনই উর্দু ভাষায় কবিতা লিখতেন। আসফাক ‘ওয়ারসি’ ও ‘হজরত’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। কবিতার প্রতি অনুরাগ তাঁদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে তোলে। ধর্মীয় পরিচয়ে ভিন্ন হলেও দেশমাতৃকার মুক্তির প্রশ্নে তাঁদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন।

১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট ব্রিটিশ সরকারের অর্থ বহনকারী ট্রেনের কোষাগার লুটের ঘটনা ইতিহাসে ‘কাকোরি ট্রেন ডাকাতি’ নামে পরিচিত। বিপ্লবী সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা ও অস্ত্র সংগ্রহের অর্থ জোগাড়ের উদ্দেশ্যে এই অভিযান চালানো হয়। রামপ্রসাদ বিসমিলসহ কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে আসফাকউল্লা খানও এতে অংশ নেন। ঘটনাটি ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। বিপ্লবীদের ধরতে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়।

অনেক দিন আত্মগোপনে থাকার পর দিল্লিতে এক পরিচিত ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতায় গ্রেপ্তার হন আসফাক। তাঁর বিরুদ্ধে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় বিচার শুরু হয়। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করলেও আসফাক বন্ধুত্ব ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে ছিলেন অবিচল। রামপ্রসাদ বিসমিলের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা প্রমাণ করে, স্বাধীনতার সংগ্রামে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মাতৃভূমির মুক্তিই ছিল তাঁদের কাছে বড়।

বিচার শেষে আসফাকউল্লা খান, রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী ও ঠাকুর রোশন সিংকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ফৈজাবাদ কারাগারে আসফাকউল্লা খানকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুর মুখেও তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

আসফাকউল্লা খান ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং একই সঙ্গে মাতৃভূমির প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক বিপ্লবী। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেমের কোনো ধর্ম নেই, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো সম্প্রদায়ের একার নয়। রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।

জন্মদিবসে এই মহান বিপ্লবীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মত্যাগ, আদর্শ ও দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানবিক, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করুক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ